Rakhi Bandhan 2023: রাখি বাধার সময় তিনটি গিঁট দিতে হয় কেন? জানলে অবাক হবেন

প্রতিবছর প্রাণ এর উৎসবের জন্য অপেক্ষা করে থাকা হয় অধীর আগ্রহে। তার মধ্যে একটি উৎসব হলো রাখি পূর্ণিমাভাই বোনের সুন্দর সম্পর্ককে আরো বেশি সুদৃঢ় করে তোলার জন্য এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রায় এক সপ্তাহর বেশি সময় ধরে তোড় জোড় শুরু হয়ে যায় এই উৎসবের জন্য। বোনেরা ভাই দের হাতে রাখি বাঁধার জন্য বিভিন্ন রকমের নিয়ম কানুন মেনে প্রার্থনা করেন ভাইয়ের মঙ্গল কামনায়।

রাখি বাধার সময় তিনটি গিঁট দিতে হয় কেন? জানলে অবাক হবেন
রাখি বাধার সময় তিনটি গিঁট দিতে হয় কেন? জানলে অবাক হবেন

রাখি বাঁধার সময় বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। তার মধ্যে একটি হল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, যে রাখি বাঁধার সময় কটি গিঁট দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বলে রাখা জরুরি যে, রাখি বাঁধার সময় ঠিক কটা গিঁট বাঁধতে হয় তা হয়তো সকলের নাও জানা থাকতে পারে। এই দিন ভাইয়ের সুস্বাস্থ্য, সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করে তার কব্জি তে রাখি বেঁধে দেন বোনেরা।

তবে আপনি কি জানেন রাখি পরানোর শাস্ত্রগত নিয়ম গুলি ? শুধুমাত্র রাখি বেঁধে দিলেই হবে না, এর কিছু বিশেষ নিয়ম কানুন রয়েছে, যেগুলি মেনে চললে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বহু অংশে বেড়ে যায়।

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, ভায়ের হাতে রাখি বাঁধার জন্য আপনাকে কটা গিঁট দিতে হবে আর কি নিয়ম পালন করতে হবে:

রাখি বাঁধার প্রচলিত নিয়ম:

প্রচলিত নিয়ম অনুসারে আমরা সকলেই কম বেশি জানি যে, রাখি পরানোর সময় প্রথমে ভাইয়ের মাথায় একটি রুমাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, তারপর কপালে তিলক কাটতে হয়। তাতে চাল লাগানো হয়।

এরপর ভাইয়ের ডান হাতে রাখি বা রক্ষা সূত্রটি যত্ন করে বেঁধে দেওয়া হয়। তবে এই রাখি বাঁধার সময় কটা গিঁট দেওয়া উচিত তা হয়তো অনেকেই জানেন না। খেয়াল খুশি মতো কেউ বা দুটি কেউ বা তিনটি গিঁট বেঁধে দেন।

শাস্ত্র মতে কটা গিঁট দেওয়া উচিত?

শাস্ত্র অনুসারে রাখি বাঁধার সময় তাতে তিনটি গিঁট দেওয়া উচিত। এই তিনটি গিঁট কিন্তু পৃথক পৃথক তাৎপর্য বহন করে। এর প্রথম গিঁট হল ভাইয়ের দীর্ঘায়ু এর জন্য, দ্বিতীয় গিঁট বোনের নিজের দীর্ঘায়ুর জন্য, এবং তৃতীয় গিঁট হল ভাই বোনের পবিত্র সম্পর্ক কে দীর্ঘজীবী করার কামনা করা। আর এই শেষ এবং তিন নাম্বার গিঁট অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়, কখনোই রাখি বাঁধার সময় তিনটি গিঁট দিতে একেবারেই ভুলবেন না কিন্তু।

প্রচলিত নিয়ম-নীতি: 

১) রাখি পূর্ণিমার দিন খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে স্নান করে ঈশ্বরকে প্রণাম জানান, তারপর তাদের আশীর্বাদ নিয়ে এই দিনটি শুরু করুন পারলে উপোস রাখতে পারেন।

২) সুন্দর করে ফুল, ফল, মিষ্টি, চন্দন, কুমকুম, রাখি, সবকিছু দিয়ে মঙ্গল থালি সাজাতে হবে, তারপর প্রথম সেই রাখি ইষ্ট দেবতাকে অর্পণ করতে হবে।

৩) রুপো, পিতল বা তামার থালায় রাখি, অক্ষত, রোলি, বা সিঁদুর রেখে দিন। জল বা আতর দিয়ে এগুলিকে সামান্য ভিজিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এগুলি আরো শুভ ফলদায়ক হয়ে ওঠে।

৪) রাখি বাঁধার সময় পূর্ব দিকে মুখ করে ভাইকে বসতে হয় অথবা উত্তর দিকে মুখ করে বসতে হয়। এর ফলে দেবতাদের আশীর্বাদ পাওয়া যায় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।

৫) ভাইয়ের মাথায় রুমাল অথবা কোন কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পর ভায়ের কপালে রোলির তিলক দেওয়া উচিত। তিলকের উপরে সামান্য অক্ষত অথবা চাল লাগিয়ে ভাইয়ের মাথায় আশীর্বাদ স্বরূপ চাল ছিটিয়ে দিতে হয়।

৬) ভাইয়ের উপরে যদি কোন কু-নজর পড়ে থাকে তাহলে প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করার মধ্যে দিয়ে সেই নজর দোষ দূর হয় বলে ধারণা করা হয়।

৭) রাখি পরানোর পরে ভাই বোনেরা একে অপরকে মিষ্টি মুখ করাবেন এটা স্বাভাবিক, এরপরে ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটানো হয়।

৮) তবে এই শুভদিনে বাড়িতে সত্যনারায়ণের পুজো করতে পারলে খুবই শুভ ফল পাওয়া যায়। যা বাস্তব মতে সকল নেগেটিভ এনার্জিকে দূর করে পজিটিভ বাতাবরণ তৈরি করে।

৯) এছাড়া যদি কৃষ্ণ ভজন করা যায় তাহলে তো খুবই ভালো।

১০) যদি সম্ভব হয় তাহলে এই শুভদিনে বাড়িতে জোয়ারের জল তুলে এনে গৃহের সমস্ত জায়গায় কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দিলে ও ওই জল ঠাকুরের স্থানে রেখে দিলে তা অবশ্যই সৌভাগ্য সূচক হবে।

১১) এই শুভদিনেই গৃহে ঘি এর প্রদীপ, সুগন্ধি ইত্যাদি দ্বারা পজেটিভ বাতাবরণ তৈরি করা উচিত যা বাস্তুশাস্ত্র মতে খুবই শুভ।

রাখিতে তিনটি গিঁট এর রহস্য তো জানলাম, তবে এই রাখি বন্ধন যেখানে যেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে সে সম্পর্কে একটু ধারণা করা যাক:

ভাই বোনের সু-সম্পর্কের একটি সুন্দর অনুষ্ঠান হল এই রাখি বন্ধন উৎসব। হিন্দু ধর্মে, জৈন ধর্মে, শিখ ধর্মে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করা হয় এবং এর ইতিহাসও রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমস্ত দেশের মধ্যে এবং সমস্ত জাতির মধ্যে ভাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে রাখি বন্ধন উৎসব চালু করেছিলেন। এছাড়া এই শুভদিনে শ্রী রামচন্দ্র সমস্ত বাঁদর সেনাদের হাতে ফুলের রাখি পরিয়ে দিয়েছিলেন।

তার পাশাপাশি মহাভারতে আছে, একটি যুদ্ধে কৃষ্ণের কব্জিতে আঘাতের কারণে রক্তপাত শুরু হওয়ায় পান্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী তার শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এতে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে অভিহিত করেন। সেটাও কিন্তু রাখি বন্ধন এর মতই হয়ে গেল।

ঐতিহাসিক রাখি বন্ধন এর একটি ঘটনা:

ঘটনা ১: রাখি বন্ধন উৎসব নিয়ে অনেক পৌরাণিক কাহিনী, গল্প তো আছেই। তার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক রাখি বন্ধন হল ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছিলেন।  আলেকজান্ডার কে পবিত্র সুতো পাঠিয়ে তাকে অনুরোধ করলেন তার ক্ষতি না করার জন্য।

এছাড়া পুরু ছিলেন কত রাজা এবং তিনি আলেকজান্ডার এর স্ত্রীর কথা শুনেছিলেন। সেই কারণে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডারকে কোনভাবেই আঘাত করেন নি। আর এই ক্ষেত্রে ভাতৃত্বের কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনোভাবেই আঘাত হানাহানি হয় নি।

ঘটনা ২: আরো একটি জনপ্রিয় গল্প অনুযায়ী জানা যায় যে, চিতোরের রানী কর্ণবতী ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়েছিলেন। সুলতান বাহাদুর চিতোর আক্রমণ করলে রানী কর্ণবতী অসহায় বোধ করেন এবং তিনি হুমায়ুন এর কাছে তার সাহায্য প্রার্থনা করেন।

তার রাখি পাঠানোর ক্ষেত্রে হুমায়ুন অভিভূত হয়ে চিতোর রক্ষার জন্য সৈন্য পাঠান। এখানেও কিন্তু একটা ভাই বোনের সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয় যার জন্য সাহায্য এর মধ্যে দিয়ে বোনের সম্মান রক্ষা করা হয়েছিল।

⭐ ঐতিহাসিক ঘটনা ও পৌরাণিক কাহিনী সবকিছু মিলিয়ে রাখি বন্ধন উৎসব সকলের কাছে এক সুন্দর পবিত্র উৎসব। এর জন্য সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকা হয়। মাস খানেক আগে থেকে দোকানে দোকানে সুন্দর সুন্দর রাখির সমাবেশ চোখে পড়ার মতো। সমস্ত রকম নিয়ম কানুন মানার মধ্যে দিয়ে রাখি বন্ধন উৎসব হয়ে উঠুক সকলের জন্য মঙ্গলময়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *