Kali Puja 2023: কালী পূজায় করা হয় অলক্ষ্মী পূজা, কারণটা জানলে অবাক হবেন

কালীপূজার আমাবস্যার রাতে যেমন মা কালীর পূজা করা হয় ঠিক তেমনি করা অলক্ষ্মী পূজা। কেন? জানেন না হয়তো! আসুন জেনে নিন কি জন্য করা হয় আর কিভাবে করা হয়।

প্রতি পদে পদে উৎসব আনন্দ বাঙালির জীবনকে সুন্দর করে আনন্দে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। কথায় আছে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। ৩৩ কোটি দেব-দেবীর মধ্যে বাঙ্গালীদের জীবনযাত্রা চলে।

তার মধ্যে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মী পূজার আনন্দ কাটিয়া আসার পর কালী পূজার আনন্দে মেতে ওঠেন সকলেই। তবে এই সময়টি সমস্ত দেশে ধনতেরাস অথবা দীপাবলি হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।

কালী পূজায় করা হয় অলক্ষ্মী পূজা, কারণটা জানলে অবাক হবেন
কালী পূজায় করা হয় অলক্ষ্মী পূজা, কারণটা জানলে অবাক হবেন

আবার এই কালী পূজার দিন অনেকেরই ঘরে বিশেষ করে বাঙালির ঘরে অলক্ষী পূজা করা হয়। লক্ষ্মী দেবীর নাম তো শুনেছেন, তবে এই অলক্ষী দেবী আবার কে?  কেনই বা তার পূজা করা হয়? কেনই বা তাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়?

কালীপূজার এই অমাবস্য্যায় অলক্ষী তাড়ানোর রীতি ও নিয়ম সকলেই পালন করে থাকলেও অনেকেই হয়তো জানেন না যে এই অলক্ষী আসলে কে? তাকে কেন অলক্ষী বলা হয়?  আর কেন তাকে তাড়ানো হয়ে থাকে?

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, অলক্ষ্মী পূজা সম্পর্কিত বেশ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য: 

অলক্ষ্মী দেবীর জন্ম কথা:

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, এই অলক্ষী হল দেবী লক্ষ্মীর বড় বোন। সমুদ্রমন্থনের সময় সমুদ্র থেকে তোলা অমৃতর কলসি নিয়ে উঠে এসেছিলেন দেবী লক্ষ্মী আর গরল অথবা বিষের পাত্র নিয়ে উঠে এসেছিলেন এই অলক্ষ্মী।

আবার আরো অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় ব্রহ্মার মুখের জ্যোতি থেকে জন্ম হয়েছে দেবী লক্ষ্মীর এবং তার মাথার পেছনের অন্ধকার থেকে জন্ম হয়েছে অলক্ষীর। আর সেই কারণেই অলক্ষ্মী সংসারের জন্য খুবই অমঙ্গল জনক।

অলক্ষ্মীর রূপ ও স্বভাবের বর্ণনা:

দেবী লক্ষ্মীর রূপ এবং স্বভাব সম্পর্কে আমরা তো সকলেই কমবেশি অবগত। তবে অলক্ষী হল দেবী লক্ষ্মীর সম্পূর্ণ বিপরীত। একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে, আমরা প্রায় কোন অত্যন্ত চঞ্চল অথবা কাজী-কর্মে অকর্মণ্য, অপরিচ্ছন্ন মেয়েদের অলক্ষ্মী বলে সম্বোধন করতে শুনি। তার কারণ হলো অলক্ষী কিন্তু এমনই স্বভাবের দেবী বলে জানা যায়।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, অলক্ষী অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন, ছন্নছাড়া, গায়ের রং ময়লা, কুঁচকানো চামড়া, মাথার চুল অবিন্যস্ত এবং কাপড় যেটি পরে থাকেন সেটিও কিন্তু খুবই ময়লা আর এই দেবীর বাহন হল গাধা। শুধু রূপের দিক থেকেই নয়, তিনি স্বভাবের দিক থেকেও দেবী লক্ষ্মীর সম্পূর্ণ বিপরীত।

কেননা যেখানে হিংসা, ঝগড়া, অহংকার, একে অপরের প্রতি ঈর্ষা, অপরিচ্ছন্নতা এবং অন্ধকার সেখানেই এই দেবীর বসবাস। তিনি নিজের সঙ্গে দুর্ভাগ্য বহন করে নিয়ে আসেন, আর সেই কারণে কোন বাড়িতে এই অলক্ষীর ঠাঁই জোটে না। কারণ সকলেই চান যে তার বাড়িতে সর্বদাই শান্তি, সুখ এবং ধনসম্পদ স্থায়ীভাবে বিরাজ করুক।

লক্ষ্মী দেবী যেমন কোন রকম হট্টগোল পছন্দ করেন না, সেই কারণে লক্ষ্মী পূজায় কাঁসর, ঘন্টা বাজাতে নেই, শুধুমাত্র শাঁখ আর উলুধ্বনিতে তাকে পূজা করা হয়। তেমনি অলক্ষী হল এই সমস্ত উচ্চ স্বর পছন্দ করেন।

তাইতো অলক্ষ্মী তাড়ানোর জন্য ভাঙা টিন, ভাঙ্গা কুলো, এগুলি বাজিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বিদায় করা হয়।

অলক্ষ্মী পূজার কারণ:

কালীপূজা অথবা দীপাবলি আমাদের কাছে সমাজে এবং সেই সঙ্গে মনের অন্ধকার অথবা অশুভ শক্তির বিনাশের একটি শুভ উৎসব। তাই এই বিশেষ দিনটিতে অলক্ষী পূজা করার একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। যা কিনা অনেক প্রাচীনকাল আগে থেকে খুবই সুন্দরভাবে পালন করে আসছেন সকলেই।

দেবী লক্ষ্মী এবং অলক্ষ্মীর সহাবস্থান কিন্তু একই সাথে ঘটে। অর্থাৎ যেখানেই দেবী লক্ষ্মীর আগমন সেখানেও কিন্তু পিছু পিছু অলক্ষ্মীর আগমন ঘটতে পারে, তবে সেটা অদৃশ্য ভাবে। সেখানে অহংকার, ঈর্ষা ও মলিনতার আগমনের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

তাই এই অলক্ষ্মী পূজার মাধ্যমে আমাদের মনের ঈর্ষা, মলিনতা, অহংকার ও তার সাথে আসা সকল প্রকার দুর্ভাগ্য কে দূর করে ধনসম্পদ, সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর বন্দনা করে তাকে আমাদের গৃহে সারা জীবনের জন্য স্থাপন করা হয়। সেই কারণে অলক্ষী পূজা ও অলক্ষী বিদায় করা প্রতিটি গৃহস্থ বাড়ির জন্য খুবই মঙ্গলজনক।

অলক্ষ্মী বিদায়ের পরে লক্ষ্মীর পূজা:

এই দিন ঘর বাড়ি পরিষ্কার করে চালের গুঁড়ো দিয়ে লক্ষীর পা এঁকে আলপনা দেওয়া হয়। ঘরের চারপাশে আলো এবং প্রদীপ, মোমবাতি জ্বালানো হয়।

এর ফলে আমাদের মনের অন্ধকারের পাশাপাশি অমাবস্যার অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলোকিত হয়ে ওঠে চারিপাশ। আমাদের ঘরের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আর অন্ধকার মানেই অশুভ শক্তিকে দূর করতে দীপাবলীর থেকে শুভ দিন ও তিথি আর কিছুই হতে পারে না, তাই না !

লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মীর সাথে আমাদের মনের মিল:

এগুলি তো শুধুমাত্র বাহ্যিক দিক, কিন্তু আমাদের মনের সাথে যদি মিল খুঁজে পান সে ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী হলো আমাদেরই মনেরই দুই স্বত্বা।

বাইরের সুখ ও সৌভাগ্যের আলোয় যাতে আমাদের মনের ভিতর ঈর্ষা এবং অহংকারের অন্ধকার না আসে, মনুষত্বকে গ্রাস না করে ফেলে, তার জন্যই এই অলক্ষ্মী পূজার প্রচলন রয়েছে।

সেই কারণে কালী পূজার অমাবস্যায় সকলের মনের অলক্ষ্মী দূর হয়ে যাক এবং মা লক্ষ্মীর কৃপায় সকলের মন সুন্দর ভাবে বিকশিত হোক।

কারোর উন্নতিতে, কারোর ভালো দেখে হিংসা না এসে চেষ্টা করা অনেক গুণ ভালো। তার ফলে ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে তো বাঁচা যায়ই এবং অনেকটা উন্নতির শিখরে পৌঁছানো যায়। কেননা চেষ্টা আর পরিশ্রম কখনোই বিফলে যায় না।

আমরাই পারি আমাদের চারিপাশের অন্ধকার কাটিয়ে তুলতে, চারিদিকটা সুন্দর ভাবে সাজিয়ে আলোয় আলোকিত করে তুলতে, তার পাশাপাশি সকলের মন সুন্দরভাবে বিকশিত করতে, কেউ যেন কারোর ক্ষতির কারণ না হতে পারে।

সকলের ঘরের এবং মনের অলক্ষ্মী দূর হয়ে গিয়ে অধিষ্টান করুক দেবী লক্ষ্মী, মঙ্গল হোক সকলের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *