Maha Ashtami 2023: অষ্টমীর পূজা বিধি কি? অস্ত্রের পূজা কেন হয়? জেনে নিন

হিন্দুধর্মে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে পূজা পার্বণের মধ্যে দুর্গোৎসব সবচেয়ে বড় উৎসব এবং দুর্গাপূজা সকলের কাছে অন্যান্য ধর্মীয় আচারের থেকেও অনেক বেশি আকর্ষণীয়। তবুও পূজোর কিছু নির্দিষ্ট রীতি আছে যা কখনোই উপেক্ষা করা সম্ভব নয় এবং সেগুলি মেনে নিতে হবে।

কিন্তু এই শারদীয়া দুর্গোৎসব পালিত হয়, দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রতিটি দিনের পূজা নিয়ম আলাদা আলাদা নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয়।

অষ্টমীর পূজা বিধি কি? অস্ত্রের পূজা কেন হয়? জেনে নিন
অষ্টমীর পূজা বিধি কি? অস্ত্রের পূজা কেন হয়? জেনে নিন

অষ্টমীর সকাল মানেই নতুন জামা কাপড় পরে পূজা মন্ডপে গিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া আর তার সাথে রয়েছে এমন অনেক বিধি-বিধান সেগুলি মেনে চলতে হবে অবশ্যই অবশ্যই।

শুভ মহা অষ্টমী:

দুর্গাপূজার আরো অন্যান্য শুভ দিনের মধ্যে মহা অষ্টমীর এই শুভ দিনটি সকলের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টমীর সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে ঠাকুরের সামনে বসতে হয়। তিনবার হাতে গঙ্গা জল নিয়ে ‘আচমন’ করতে হয়। নারীরা সুন্দর সুন্দর শাড়িতে এবং পুরুষেরা ধুতি পাঞ্জাবি অথবা কুর্তা পাঞ্জাবিদের সেজে ওঠেন।

অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়ার ক্ষেত্রে হাতে ফুল নিয়ে তিনবার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র পড়ে দেবী দুর্গার চরণে সেই ফুল অর্পণ করতে হয়। এখানে প্রণাম মন্ত্র হলো:- “ওম সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে শরণ্যে ত্রম্ব্যকে গৌরী নারায়নী নমস্তুতে”

শুভ অষ্টমী শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

এছাড়াও আরো অন্যান্য মন্ত্রের মধ্য দিয়ে পুষপাঞ্জলি সম্পন্ন করা হয়। সকল মেয়েই মা দুর্গার অংশ, তাই মৃন্ময়ী প্রতিমাকে পূজা করার পাশাপাশি কম বয়সের ছোট মেয়েদেরও পূজা করা হয় যা “কুমারী পূজা” নামে বিশেষভাবে পরিচিত। মহাষ্টমীর দিন কুমারী মেয়ে বিশেষত যে সকল মেয়ের বিবাহের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বা বিবাহ স্থির হয়েও বার বার ভেঙে যাচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বিশেষ শুভ ফল প্রদান করতে পারে এই মহা অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি।

লাল অথবা হলুদ বস্ত্র দেবী দুর্গাকে প্রদান করতে পারেন, লাল অথবা হলুদ সুতো মায়ের কাছে নিবেদন করে সেটি হাতে বাঁধতে পারেন। এর পাশাপাশি ডাব, মিষ্টি, ফল, চিনি ইত্যাদি দিয়ে পূজা করার প্রথা রয়েছে। নিজের মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্য সংকল্প করতে হবে একাগ্র চিত্তে। নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হবে পূজার কয়েক দিন এবং ঘি এর প্রদীপ জ্বালাতে পারেন।

মহা অষ্টমীতে মহাগৌরীর পূজা:

দুর্গাপূজার নবরাত্রীর অষ্টম দিনে পূজিত হন দেবী মহাগৌরী। পুরাণের কাহিনী অনুসারে পার্বতী ছিলেন গৌরবর্ণা। কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেব কে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য প্রখর রোদে তপস্যা করেছিলেন পার্বতী। আর সেই কারণে রোদের তেজে কৃষ্ণবর্ণা হয়ে যান তিনি। এরপর স্বয়ং শিব গঙ্গা জলে স্নান করিয়ে দেন পার্বতীকে, আর তাতেই নিজের পুরনো বর্ণ ফিরে পান দেবী পার্বতী।

দেবীর এই রূপই হলো মহাগৌরী রূপ, এই রূপে দেবীর বাহন সাদা ষাঁড়। এছাড়া দুর্গাপূজা বা নবরাত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো অষ্টমী, দেবীর আরাধনায় এই দিনটিকেই সবচেয়ে বেশি পবিত্র এবং শুভ বলে মনে করা হয় যে, এই দিনেই অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির আবির্ভাব হয়।

মহা অষ্টমীতে যে কাজগুলি করলে দেবী দুর্গা রুষ্ট হতে পারেন

অষ্টমীতে অস্ত্র পূজা:

দূর্গা পূজার এই এই চার দিন খুবই শুভ এবং পবিত্র বলে বিবেচনা করা হয়। তবে এই চার দিনের মধ্যে মহা অষ্টমী হলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এই অষ্টমী তিথিতে এই দেবী দুর্গাকে নানা রকম অস্ত্র প্রদান করে রণসাজে সাজিয়ে তুলেছিলেন দেবতারা।

আর সেই কারণে এই দিনে দেবীর অস্ত্র গুলিকে দেবজ্ঞানে পূজা করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই ভারতের অনেক জায়গায় এই শুভদিনে অস্ত্র পূজার দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেউ কেউ আবার অষ্টমী তিথিকে “বীরাষ্টমী” ও বলে থাকেন। এছাড়াও অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে এবং শত্রুদের দমন করতে অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। সেই অস্ত্র একটি শক্তিরূপে কাজ করে, তাই তাকে পূজা করাটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে অনেকেই এই দিনটিকে অস্ত্র পূজার দিন হিসেবে ধরেছেন। এর পাশাপাশি মহাষ্টমীর দিন অষ্টশক্তি বা অষ্ট মাতৃকার পূজা করা হয়ে থাকে।

মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার মাহাত্ম্য জেনে নিন

অষ্টমীতে কুমারী পূজা:

মহা অষ্টমীতে বিভিন্ন পূজা বিধির মধ্যে কুমারী পূজা হলো একটি বিশেষ পূজা নিয়ম। এক বছর থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ঋতুমতি না হওয়া কুমারী মেয়েকে এই দিনে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয় তাদের।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো ভক্তদের কাছে মহাষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনও এক আলাদা আবেগ বহন করে। যা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে এবং এই দিনে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার জন্য সেজে ওঠেন সকল নারী-পুরুষ থেকে বাচ্চা বুড়ো সকলেই।

শুভ কুমারী পূজা শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

অষ্টমীতে সন্ধি পূজা:

মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার পরে সন্ধ্যাবেলা সন্ধি পূজার এই অনুষ্ঠানটি ভক্তি ও আগ্রহের সাথে দেখার জন্য মন্ডপে এবং অনেক বনেদি বাড়িতে যেখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় সেখানের ভিড় চোখে পড়ার মতো। ১০৮ টি লাল পদ্ম উৎসর্গ করা হয় দেবীর চরণে, এই সময় জ্বলে ওঠে ১০৮ টি প্রদীপ।

অষ্টমী – নবমী তিথির শুভ সন্ধিক্ষণে এই সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ঢাকের বাদ্যি, উলুধ্বনি, ঘন্টা, সবমিলিয়ে শব্দের স্রোত যেন ভাসিয়ে নিয়ে যায় চারিদিকের পরিবেশ এবং সকল মানুষের মন। এই সন্ধিপূজাতে ১০৮ টি পদ্ম ফুল অর্পণ করার পাশাপাশি ১০৮ টি প্রদীপ জ্বালানো হয় এবং তার সাথে সাথে আরতিও চলে।

সন্ধি পূজার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ কেউ বলি দিয়ে থাকেন। আবার কেউ কেউ সিঁদুর সিক্ত এক মুঠো মাসকলাই ও বলি দেন। তবে সব কিছুই কিন্তু প্রতীকী হিসেবে দেখা হয়, আগে মহিষ বলি দেওয়ার প্রথা থাকলেও তা বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত বলা যায়।

কেননা অনেক জায়গায় কুমড়ো, লাউ, চাল কুমড়ো ইত্যাদি কে বলি দিয়ে এই বলি দেওয়ার রীতি প্রথা মেনে চলা হয়। সর্বকালের সর্বক্ষণের দুষ্টের দমন হয় দেবীর দ্বারা, আর সেক্ষেত্রে এই দিনে এই বলি দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য।

শুভ সন্ধি পূজা শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

মহা গৌরীর রূপ:

মহাগৌরীর রূপ সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায় যে, সাংসারিক দিক দিয়ে মহা গৌরীর স্বরূপ অত্যন্ত উজ্জ্বল, শ্বেত বর্ণ, শ্বেত বস্ত্রধারী এবং কোমল।

এই রূপে দেবী দুর্গার এক হাতে থাকে ত্রিশূল এবং অপর একটি হাতে থাকে ডমরু। সংগীত ভালবাসেন মহাগৌরী, তিনি সাদা ষাঁড় অর্থাৎ বলদের উপরে বসে থাকেন। তাঁর ডান হাত অভয় মুদ্রা ও বাঁ হাতে শিবের প্রতিক ডমরু, মহাগৌরীর স্বরূপ হল শান্ত ও দৃষ্টিগত।

অষ্টমী তিথিতে মহাগৌরীর পূজা করলে সমস্ত মনস্কামনা পূর্ণ হয় এবং জীবনে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি আসে, শান্তিময় জীবন যাপন করা যায়।

দুর্গাপূজার দিন এই ৭টি কাজ শাস্ত্র মতে মানা

মহা অষ্টমীতে মহা গৌরীর পূজার নিয়ম:

  • প্রাণের দুর্গোৎসব, শারদীয়া দুর্গাপূজার অষ্টম দিনে ব্রহ্মমুহূর্তে উঠে অর্থাৎ সূর্য উদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে এবং স্নান করে স্বচ্ছ পোশাক পরে শুদ্ধ মনে দুর্গা মন্ত্র জপ করতে করতে ধ্যান করতে পারেন।
  • এরপর ঠাকুর ঘরের গঙ্গাজল ছেটানো প্রয়োজন, এর পাশাপাশি পাঁচটি ঘি এর প্রদীপ জ্বালাতে হবে।
  • এরপরে মহাগৌরীর পূজা শুরু করার আগে তাঁর কল্যাণকারী মন্ত্র জপ করতে হবে।
  • এরপর দেবী দুর্গাকে প্রদীপ, ফুল, অক্ষত, রোলি, ধূপকাঠি ইত্যাদি বিভিন্ন পূজার সামগ্রী অর্পণ করে ভক্তি জানাতে হবে।
  • নারকেল ও নারকেলের তৈরি জিনিসের ভোগ নিবেদন করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে নারকেলের সন্দেশ, নারকেল নাড়ু, এই সমস্ত মিষ্টি আপনি অর্পণ করতে পারবেন।
  • মহা গৌরীর পূজায় গোলাপি রঙের পোশাক পরা খুবই শুভ বলে মনে করা হয়।
  • দেবীকে লাল রঙের চুড়ি, পয়সা এবং বাতাসা নিবেদন করুন।
  • আবার অনেকে মহাষ্টমীতে ১১ টি অশ্বত্থ গাছের পাতায় ঘি ও সিঁদুর মিশিয়ে রামের নাম লিখে থাকেন।
  • সেগুলো হনুমানের চরণে অর্পণ করেন এবং ভক্তদের বিশ্বাস এতে জীবনের নানা বাধা কেটে যায়, সামাজিক সম্মান বৃদ্ধি পায়।

শুভ ধুনুচি নাচ শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

মহা অষ্টমীর তাৎপর্য:

দুর্গাপূজার আর কয়েকটি দিনের মধ্যে এই মহা অষ্টমী এই দিনটি এতটাই পবিত্র এবং শুভ যে এই দিনটির তাৎপর্য আর সমস্ত দিনের তুলনায় অনেক বেশি। পুরাণ অনুযায়ী মহাষ্টমীতে দেবী দুর্গাকে নানা ধরনের অস্ত্র, পদ্ম ফুলের মালা, রত্ন অলংকার দিয়ে সাজিয়ে তুলেছিলেন সকল দেবতারা।

কেননা পুরাণের মত অনুসারে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা নবমী তিথিতে দেবতাদের তেজ পুঞ্জিভূত হতে শুরু করে। আর সেই পুঞ্জিভূত তেজ আশ্বিনের সপ্তমী তিথিতে বিশেষ রূপ ধারণ করে। সেই তেজের সাহায্যেই অষ্টমী তিথিতে দেবী মহিষাসুরমর্দিনী কে অর্থাৎ পার্বতী বা দেবী দুর্গাকে সাজিয়ে তুলেছিলেন দেবতারা।

বিভিন্ন পুরাণ, গ্রন্থ অনুসারে জানা যায় যে, মহাষ্টমীতে দেবীর পূজা করার সময় সঠিক নিয়ম মেনে চললে জীবনে কখনো আর্থিক দিক থেকে অবনতি ঘটে না এবং ব্যবসা হোক অথবা চাকরির ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন ঘটে। সব সময় সাফল্য আসে জীবনে। জীবনে বহু দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। আর কর্মক্ষেত্রে কোন বাধা থাকে না, অষ্টমীতে সূর্য ওঠার আগে স্নান করে লাল কাপড় পরে দেবীর পূজা করতে পারেন, এর ফলে আপনার সমস্ত মনোষ্কামনা পূর্ণ হবে।

কল্পারম্ভ কি? বোধন থেকে সন্ধি পূজা সবকিছু জানুন

✨ দুর্গাপূজার সমস্ত দিন সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক একটি বিশেষ দিন। তবে এই মহা অষ্টমীতে পালিত হওয়া বিভিন্ন নিয়ম, পূজা পার্বণ, সন্ধি পূজা, কুমারী পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, অস্ত্র পূজা, যাই কিছু থাকুক না কেন সব কিছু মিলিয়ে বাঙালির মন একেবারে ভরে ওঠে।

এই দিনটি পেরিয়ে গেলে আবার একটা বছর অপেক্ষা করতে হয় এই আনন্দমুখর এবং শুভ দিনটির জন্য। হাতে ফুল নিয়ে দেবী দুর্গার চরণে নিজের মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার প্রার্থনা করে মন্ত্র উচ্চারণ করে সেই ফুল নিবেদন করা হয়। পূজার পরিবেশের মধ্যে দিয়ে এই মহাষ্টমী তিথি সকলের মনে সীমাহীন আনন্দের সঞ্চার ঘটায়।

Leave a Comment