সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল জীবনী 2023 – ইতিহাস, পরিবার এবং স্বাধীনতা আন্দোলন কার্যক্রম

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কোথায় জন্মগ্রহণ করেন? লৌহ পুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কিভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? ওনার বাবা-মা কে? ওনার জীবন কেমন ছিল? এছাড়াও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সম্পর্কে জানা-অজানা তথ্য জানুন (Biography of Vallabhbhai Patel in Bengali)।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ভারতের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক এবং রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বল্লভভাই প্যাটেল একজন ভারতীয় রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন।

লৌহ পুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জীবন পরিচয় - Vallabhbhai Patel Biography in Bengali
লৌহ পুরুষ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জীবন পরিচয় – Vallabhbhai Patel Biography in Bengali

তিনি ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রথম উপ – প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন সিনিয়র নেতাও ছিলেন। যিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি একটি অখন্ড স্বাধীন দেশে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

কংগ্রেসের রক্ষণশীল সদস্যের একজন ছিলেন তিনি। তাছাড়া তাকে প্রায়ই সর্দার বলা হত, যার অর্থ হল হিন্দি, উর্দু এবং ফারসি ভাষায় প্রধান অর্থাৎ কোন দলের প্রধান কে সর্দার বলা হয়। সেই হিসেবে তার নামের সাথে সর্দার যুক্ত হয়ে গিয়েছে।

তো চলুন এই স্বাধীনতার সংগ্রামী তথা দেশের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জীবনী সম্পর্কে জানা যাক:

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জীবনী:

  • সম্পূর্ণ নাম: বল্লভভাই প্যাটেল
  • জন্ম তারিখ: ৩১ শে অক্টোবর ১৮৭৫ সাল
  • জন্মস্থান: বোম্বে, ব্রিটিশ ভারত
  • পিতার নাম: জাভের ভাই এবং
  • মায়ের নাম: লাড বাই
  • স্ত্রীর নাম: ঝাভীর বা
  • সন্তান: মানিবেন প্যাটেল, দয়া ভাই প্যাটেল
  • আন্দোলন: ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, ভারত ছাড়ো আন্দোলন
  • রাজনৈতিক দল: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস
  • পুরস্কার: ভারতরত্ন (১৯৯১)
  • মৃত্যু: ১৫ ই ডিসেম্বর ১৯৫০

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের পরিবার ও শৈশব জীবন: 

বল্লভভাই প্যাটেলের জন্ম হয়েছিল ৩১ শে অক্টোবর ১৮৭৫ সালে। তিনি তার মামার গ্রাম নদীয়াদ, সেখানে জন্মগ্রহণ করেন, আর বল্লভভাই প্যাটেল এর বাবার নাম ছিল জাবের ভাই এবং মায়ের নাম ছিল লাডবাই, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তারা চার ভাই ও এক বোন ছিলেন।

চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার থেকে ছোট এবং বাবার সব থেকে প্রিয় পুত্র। তিনি সব থেকে প্রিয় ছিল এই কারণে, চার ছেলের মধ্যে  বল্লভভাই প্যাটেল তার বাবার প্রতিটি কাজে সাহায্য করতেন এবং তার বাবা তার শিক্ষার জন্য সম্পূর্ণ খরচ করতেন।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের শিক্ষাজীবন: 

তিনি তার স্কুল শিক্ষা শেষ করতে অনেকটা সময় নিয়েছিলেন। তারপর ২২ বছর বয়সে দশম শ্রেণী অর্থাৎ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। সরদার বল্লভভাই প্যাটেল কে পড়াশোনা শেষ করতে নদীয়ার দের পেটলাদ ও বোরসাদ যেতে হয়েছিল।

আর এই ভাবেই কিন্তু তিনি তার পড়াশোনা শেষ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে আরও পড়াশোনা করার জন্য আহমেদাবাদে চলে যান। বল্লভভাই প্যাটেল পরিবারে আর্থিক সমস্যার কারণে আর তিনি কলেজে যেতে পারেননি, কিন্তু তিনি বই কিনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে দেন। এই পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন।

আইন পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে চলে যান। কিন্তু যেহেতু তার কোন কলেজের জ্ঞান ছিল না, সেই কারণে ৩৬ মাস অর্থাৎ তিন বছর পর্যন্ত অ্যাডভোকেসি স্টাডি করতে হয়। কিন্তু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ৩০ মাসের মধ্যেই এডভোকেসি কোর্স শেষ করেন এবং তারপর তিনি একজন আইনজীবী হোন।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ব্যক্তিগত জীবন: 

বল্লভভাই প্যাটেল এর বয়স যখন ১৮ বছর ছিল, তখন তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তখন তার বাবা তাকে পাশের গ্রামে বিয়ে দিয়েছিলেন, তার স্ত্রীর নাম ছিল ঝাভির বা। কিন্তু তিনি পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন। বিয়ের ৩-৪ বছর পর তার স্ত্রী একটি ছেলে ও একটি মেয়ের জন্ম দেন।

আগেকার দিনে অনেকগুলি প্রথার মধ্যে একটা একটি প্রথা প্রচলিত ছিল যে যতক্ষণ না পর্যন্ত স্বামী নিজে থেকে কাজ করে অর্থ উপার্জন করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার স্ত্রী তার বাবার কাছে থাকবে এবং স্বামীকে একা একা থাকতে হবে।

মহাত্মা গান্ধী ও জহরলাল নেহেরুর সাথে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের আলাপ: 

যেহেতু আমরা সকলেই জানি যে, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল, কিন্তু তাদের মধ্যে রাত দিনের পার্থক্য ছিল, এবং সরদার বল্লভভাই প্যাটেল দুজনেরই ব্যারিস্টার ডিগ্রি ছিল, কিন্তু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল দুটোতেই অনেক এগিয়েছিলেন।

চলুন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের বিচার এবং প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে জানা যাক: 

  • আমাদের অপমান সহ্য করতে শিখতে হবে।
  • সর্বদাই অন্যদের সাহায্য করুন।
  • আমার একটাই ইচ্ছা ভারত দেশ যেন একটা ভালো উৎপাদক হয়ে ওঠে এবং খাবারের জন্য চোখের জল ফেলতে গিয়ে ভারতে কেউ যেন ক্ষুধার্থ না থাকে।
  • ধনী, গরিব, উঁচু, নিচের মধ্যে ভেদাভেদ করা উচিত নয়।
  • ভালোবাসা ও শান্তির সাথে যাই করুক না কেন সেই কাজ শত্রুতার সাথে হয় না।
  • নিজের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস থাকতে হবে।
  • আমাদের দেশের মাটিতে অনন্য কিছু আছে যা অনেক বাধা সত্বেও সর্বদা মহান আত্মার আবাসস্থল।
  • সর্বদা ঠান্ডা থাকা উচিত।
  • আপনার চিন্তা বড় হওয়া উচিত।
  • মানুষ তার কর্ম দ্বারা বড় হয়, সম্পদ দ্বারা নয়।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা: 

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা খুবই প্রয়োজন ছিল এবং তার জন্য দুই ধরনের আন্দোলন হয়েছিল একটি ছিল অহিংস আন্দোলন এবং অন্যটি ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন। ১৮৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ভারতের স্বাধীনতার জন্য করা সমস্ত প্রচেষ্টাতে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন বিপ্লবী এবং শহীদরা।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মহাত্মা গান্ধী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ  ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া বারদোলি সত্যাগ্রহে ও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং মহাত্মা গান্ধী।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের “ভারত ছাড়ো আন্দোলনে” যোগদান: 

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন সংগ্রহ করেন এবং ১৯৪২ সালে আবার ব্রিটিশ অফিসারদের দ্বারা গ্রেফতার হয়ে পড়েন। বল্লভভাই প্যাটেল ১৯৪৭ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডি ফ্যাক্টও  সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন।

এছাড়া ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মহাত্মা গান্ধীর সমস্ত ধারণা ও প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং মুসলিমরা এই আন্দোলনকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিল। মুসলমানরা প্রকাশ্যে এই প্রতিষ্ঠান এবং এর কট্টর সমর্থকদের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মৃত্যু: 

বল্লভভাই প্যাটেল ১৫ ই ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং এই “লৌহ পুরুষ” পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন এই দিনটিতে। সর্দার প্যাটেল কে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে মুম্বাইয়ে দাহ করা হয়েছিল।

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন স্বাধীনতার সংগ্রামী। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আজও তাকে স্মরণ করা হয়। বর্তমানে বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। তার নামে যে স্টেডিয়াম রয়েছে সেই নাম প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিবর্তন করে সর্দার প্যাটেল স্টেডিয়াম রেখেছেন। ভারতের প্রথম উপ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তিনি আজও ভারতবাসীর কাছে একজন “লৌহ পুরুষ” হিসেবে পরিচিত হয়ে রয়েছেন এবং চিরকাল অমর হয়েও থাকবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *