তাপপ্রবাহ বিপদজনক, জানুন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পাবেন কিভাবে?

তাপপ্রবাহ আপনার জন্য বিপদজনক ও ক্ষতিকারক, গ্রীষ্মের তাপ থেকে রক্ষা কিভাবে পাবেন? গ্রীষ্মের দাবদাহ অথবা তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে আপনার যে সমস্ত বিষয় গুলির উপরে বিশেষভাবে খেয়াল রাখাটা জরুরি সেগুলি এখানে জানুন।

বৈশাখ মাস পড়তে না পড়তেই যেন আগুন পড়তে শুরু করেছে। গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষ একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বাইরে কয়েক মিনিটের বেশি একেবারেই থাকা যায় না বললেই চলে। বৃষ্টির দেখা নেই বেশ অনেকদিন হয়ে গেল। সেই কারণে গরম যেনো পিছু ছাড়ছেই না।

তাপপ্রবাহ বিপদজনক, জানুন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পাবেন কিভাবে?
তাপপ্রবাহ বিপদজনক, জানুন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পাবেন কিভাবে?

এই গরম থেকে হিট স্ট্রোক এর ঝুকি বেড়ে চলেছে শিশু এবং বয়স্কদের জন্য। তার সাথে সাথে ছাড় নেই মধ্যবয়সী দেরও। তবে আপনি যদি বেশ কিছু বিষয় খেয়াল করেন, তাহলে গরমের এই দাপট থেকে অনেকটাই রক্ষা পেতে পারেন। নিজের সাথে সাথে পরিবারের অন্যান্য সদস্য, গৃহপালিত পশু-পাখি, সবাইকে এই গরম থেকে বাঁচাতে পারবেন।

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, বেশ কিছু বিষয় সম্পর্কে, যে গুলি এই অসহ্য গরমে করতে পারেন এবং যেগুলি করা থেকে বিরত থাকতে পারেন: 

তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে কি করবেন?

১) পাতলা এবং হালকা রঙের পোশাক পরুন: এই সময় একেবারে মোটা এবং চড়া রংয়ের পোশাক না পরাই ভালো। এক্ষেত্রে সূর্যের রশ্মি খুবই দ্রুত শোষণ করতে পারে। হালকা রঙের পোশাক, তার সাথে সেই পোশাক যেন খুবই নরম এবং পাতলা হয়ে থাকে। তাহলে আপনি অনেকটাই স্বস্তি পাবেন।

২) বাড়ির বাইরে থাকার সময় সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। সেক্ষেত্রে ছাতা ব্যবহার করতে পারেন, স্কার্ফ ব্যবহার করতে পারেন। মাথা কে সম্পূর্ণরূপে স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে তবেই সরাসরি রোদে বের হবেন।

৩) শরীরের জলশূন্যতা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত জল এবং শরবত পান করতে পারেন। এক্ষেত্রে ডাবের জল খুবই উপকারী।

৪) গ্রীষ্মকালীন ফল পাওয়া যায়, বিশেষ করে তরমুজ বেশি বেশি করে খেতে পারেন অথবা কোন ফলের জুস পান করতে পারেন।

৫) সব সময় ছাতা এবং টুপি ব্যবহার করুন, যা কিনা আপনাকে চড়া রোদ থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবে।

৬) ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচানোর জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন, তার সাথে সাথে হালকা, সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা পোশাক ব্যবহার করতে পারেন, যেখানে সরাসরি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি না পড়তে পারে।

৭) পশু পাখিদের ছায়াযুক্ত আশ্রয় এ রাখুন এবং তাদের যথেষ্ট পরিমাণ খাবার জল রাখুন সাথে।

৮) স্থানীয় আবহাওয়ার সতর্কবার্তার দিকে খেয়াল রাখুন।

৯) যদি কোন ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে একেবারে দেরি না করে, চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন।

১০) বাড়িতে তৈরি করা একেবারে প্রাকৃতিক ভাবে লেবুর জল, কোন শরবত তৈরি করে পান করতে পারেন।

এবার জানা যাক, কি কি করবেন না?

১) যতটা পারা যায় প্রখর রোদে না বেরোনোর চেষ্টা করুন। তবে যদি কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য আপনাকে একান্তই বের হতেই হয়, তাহলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করবেন এবং একেবারে সরাসরি প্রখর রোদে না থাকার চেষ্টা করবেন।

২) কোন থামিয়ে রাখা গাড়িতে শিশু অথবা গৃহপালিত পশুদের রেখে কোথাও যাবেন না, সে ক্ষেত্রে তাদের অনেকটাই অসুবিধা হতে পারে, তার সাথে সাথে অসুস্থ হয়েও পড়তে পারে তারা।

৩) বেশি প্রোটিন যুক্ত এবং মশলাদার খাবার কখনোই খাবেন না, বিশেষ করে প্রখর গরমে।

৪) মাংস জাতীয় খাবার থেকে বিরত থাকুন তার পরিবর্তে হালকা সবজির তরকারি খেতে পারেন খুবই কম মশলা দিয়ে।

৫) দিনের বেলায় তীব্র রোদে পরিশ্রমজনিত কোন কাজ না করাই ভালো। তার পরিবর্তে সেই কাজ সূর্য অস্ত যাওয়ার পর করতে পারেন। আর যদি সেই কাজ একেবারেই নিজস্ব হয়ে থাকে তাহলে তো আর কথাই নেই।

হিট স্ট্রোক কি?

প্রচণ্ড গরমে মানুষের এই হিট স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাইরে তাপমাত্রা যাই হোক না কেন, আমাদের শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপমাত্রা প্রায় স্থির রাখতে সক্ষম।

কিন্তু যখন অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখনই কিন্তু এই হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়ে কোনো ব্যক্তি। এর ফলে ঘাম বন্ধ হয়ে গিয়ে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত তরতরিয়ে বাড়তে থাকে।

হিট স্ট্রোকের লক্ষণ: 

  • শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়া।
  • মাথা ঘুরতে থাকা।
  • গরমের দাবদাহে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।
  • তীব্র মাথা যন্ত্রণা।
  • শরীরের ঘাম কমতে কমতে একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
  • ত্বক গরম ও শুকিয়ে যাওয়া।
  • বমি বমি ভাব হওয়া।
  • শারীরিক দুর্বলতা অনুভব হওয়া, তার সাথে পেশিতে টান অনুভব করা।
  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া।
  • কোন কোন ক্ষেত্রে খিঁচুনিও হতে পারে।
  • নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট।
  • মানসিক বিকার কিছুক্ষণের জন্য দেখা দিতে পারে।

কোন ব্যক্তি হিটস্ট্রোকে অসুস্থ হলে কি করবেন?

১) লবণ জল / চিনিযুক্ত জল / ও আর এস এগুলি প্রয়োজনে খাওয়াতে পারেন। তবে খাবার বা জল যাই হয়ে থাকুক না কেন, সেই ব্যক্তির সম্পূর্ণ জ্ঞান ফেরার পরেই কেবলমাত্র দিতে পারেন, তার আগে কিন্তু নয়।

২) হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তড়িঘড়ি ঘরের ভিতরে ছায়াযুক্ত ঠান্ডা পরিবেশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

৩) ঠান্ডা জলে ভেজা কাপড় দিয়ে সেই ব্যক্তির শরীর মুছে দিন। যাতে খুব তাড়াতাড়ি তার শরীরটা ঠান্ডা অনুভব করতে পারে।

৪) এই সমস্ত প্রাথমিক চিকিৎসার পর যদি কোনো রকম অবস্থার উন্নতি না হয়, তাহলে কাছাকাছি কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেই আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিয়ে যেতে ভুলবেন না।

গরমের এই তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আপনি আপনার ঘরকে কিভাবে ঠাণ্ডা রাখবেন?

সবার পক্ষে সম্ভব হয় না ঘরে এসি লাগিয়ে এই তীব্র গরম থেকে রেহাই পেতে। তাই আপনি মনে করলে বেশ কিছু সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করেই নিজের ঘরকে খুবই সহজেই শীতল রাখতে পারবেন।

যদিও এসির মত অতটা ঠান্ডা না হলেও আপনি সেখানে এসির মতোই অনুভূতি পেতে পারেন। যা কিনা এই অসহ্য গরম থেকে আপনাকে অনেকটাই আরাম প্রদান করতে পারে।

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে, যেগুলি করলে আপনার ঘর অনেকটাই শীতল থাকবে:- 

১) প্রথমত আসা যাক, ঘরের দরজা জানালার পর্দা গুলি খুবই মোটা এবং পুরু হতে হবে। যার ফলে দুপুরের কড়া রোদ কখনোই ঘরে ঢুকতে পারবে না। কড়া রোদ ওঠার আগে থেকেই ঘরের সমস্ত পর্দাগুলি লাগিয়ে রাখুন। তারপর সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সাথে সাথেই সেগুলি সম্পূর্ণ রূপে খুলে দেবেন।

যাতে বিকেলের ঠান্ডা বাতাস আপনার ঘরে অনায়াসেই ঢুকতে পারে। তার সাথে সাথে রাতের দিকে বাইরের পরিবেশের হাওয়া অনেকটাই শীতল হয়ে পড়ে। সেই শীতল হাওয়া আপনার ঘরে ঢুকে ঘরকে আরো বেশি শীতল করে তুলবে।

২) রাতের বেলায় টেবিল ফ্যান খোলা জানালার কাছে দিয়ে বাইরে ঠান্ডা হাওয়া ঘরে ঢোকাতে পারেন। যাতে খুব তাড়াতাড়ি ভিতরের ভ্যাপসা গরম থেকে আপনি অনায়াসেই আরাম পেতে পারেন।

৩) এছাড়াও যদি এসির মত আরাম পেতে চান তাহলে একটি গামলাতে বেশ কয়েকটি বরফের টুকরো রেখে সেটি টেবিল ফ্যানের সামনে রাখতে পারেন, টেবিল ফ্যানের হাওয়া সেই বরফের গায়ে লেগে যখন ঘরে ছড়িয়ে পড়বে তখন বরফের সেই শীতল হাওয়া ঘরকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করবে অনেক খানি

৪) এছাড়া একটি বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরী যে, বিনা কারণে ঘরে অযথা আলো জ্বালিয়ে রাখবেন না, টিভি চালিয়ে রাখবেন না, তাছাড়া আরো অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য গুলি চালিয়ে রাখবেন না।

যার ফলে একটি গরম ভাব ঘরের মধ্যে তৈরি হতে পারে। যতটা পারবেন ঘরকে অন্ধকার রাখার চেষ্টা করুন। অন্ধকার, ঘরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তার সাথে সাথে আপনার চোখের জন্যও অনেকটাই উপকারী, তাই না !

৫) প্রয়োজন ছাড়া বেশিক্ষণ গ্যাস ওভেন জ্বালিয়ে রাখবেন না। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি রান্না করার চেষ্টা করুন এবং হালকা পাতলা রান্না করার জন্য বেশি গ্যাসের প্রয়োজন পড়ে না বলেই মনে হয়।

৬) এছাড়া যারা এখনো পর্যন্ত বাড়ি তৈরি করেন নি, বাড়ি তৈরি কথা চিন্তা করছেন তাহলে তাদের জন্য একটা বিষয় খেয়াল রাখাটা জরুরি, যখন ঘর তৈরি করবেন সেই সময় হিট প্রটেক্টিভ উইন্ডো লাগাতে পারেন।

তার সাথে সাথে ঘরকে সাদা রং দিয়ে রাঙিয়ে তুলতে পারেন। কেননা সাদা রং যেমন দেখতে সুন্দর, তার সাথে সাথে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিফলিত করে আপনার ঘরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে।

৭) এছাড়া পরিবেশবান্ধব হিসাবে আপনি গাছপালা লাগাতে পারেন। গাছপালা যেমন সবুজায়ন করে থাকে, তার সাথে সাথে আপনার ঘরকে ঠাণ্ডা রাখবে একেবারে এসির মতোই।

বাড়ির চারপাশে গাছপালা লাগান, যার ফলে সরাসরি সূর্যের আলো আপনার বাড়িতে এসে পড়বে না এবং গাছের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার সময় আপনার ঘর অনেকটাই শীতল থাকবে তার সাথে সাথে দূষণমুক্ত থাকবে আপনার বাড়ির চারপাশ টা, কি বলেন ?

৮) ঘরের মধ্যেও বেশকিছু ইনডোর প্ল্যান্ট লাগাতে পারেন, এক্ষেত্রে স্নেক প্ল্যান্ট অনেকটাই ঘরকে ঠাণ্ডা রাখে বলে জানা গিয়েছে।

৯) বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় বড় পাত্রে ঠান্ডা জল রাখুন এবং তাতে কিছু সুগন্ধি ফুল যেমন ধরুন বেলফুল, গোলাপের পাপড়ি দিয়ে রাখতে পারেন এবং দিনে দুই- তিনবার জল পাল্টাতে পারেন। যতক্ষণ জল ঠান্ডা থাকে ততক্ষণ পাল্টানোর দরকার নেই, ঠান্ডা জলের বাষ্পে ভ্যাপসা গরম কেটে যাবে পুরোপুরি।

তাহলে জানা হয়ে গেল, কিভাবে সহজ পদ্ধতিতে ঘরকে শীতল রাখতে পারবেন এবং যদি বাইরে বের হন বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে পারেন। যার মধ্যে দিয়ে হিট স্ট্রোক, সানবার্ন এর থেকে রক্ষা পাবেন।

নিজের সাথে সাথে নিজের পরিবারের অন্যান্য সদস্যের খেয়াল রাখুন এবং এ বিষয়ে যারা অবগত নন, তাদের কে জানিয়ে রাখুন। আপনার আশেপাশের প্রতিবেশীদের এ বিষয়ে জানিয়ে রাখুন। যাতে তারা এমন পরিস্থিতিতে না পড়তে পারেন। এই অসহ্য গরম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং অন্যকে বাঁচান, সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন, সাবধানে থাকুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *