Bhoot Chaturdashi 2023: ভূত চতুর্দশীর দিন ১৪ রকম শাক খাওয়ার রহস্য জানেন কি

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণে ১৩ রকমের রীতি নীতি মেনে চলতে হয়, এক একটি পূজা পার্বণে এক এক রকম রীতি মেনে সেই পূজা সম্পন্ন করা হয়। তেমনিভাবে পালিত হয় ভূত চতুর্দশী অথবা নরক চতুর্দশী। যা কিনা কালী পূজার আগের দিন পালিত হয়।

বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ভূত চতুর্দশীর দিনে একটি রীতি প্রচলিত রয়েছে সেটা হল ১৪ রকম শাক খাওয়ার প্রচলন। চৌদ্দ রকম সাত খেয়ে সন্ধ্যাবেলা ১৪ টি প্রদীপ জ্বালিয়ে দূরত্ব ও অন্ধকার দূর করার রীতি প্রচলিত রয়েছে এই কালী পূজার ভূত চতুর্দশীতে।

ভূত চতুর্দশীর দিন ১৪ রকম শাক খাওয়ার রহস্য জানেন কি
ভূত চতুর্দশীর দিন ১৪ রকম শাক খাওয়ার রহস্য জানেন কি

গীতা অনুসারে জানা যায় যে, মৃত্যুর পর মানব শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায় অর্থাৎ মাটি, জল, হাওয়া, অগ্নি ও আকাশ। তাই মাটি থেকে তুলে আনা সমস্ত রকম শাক খেলে অতৃপ্ত আত্মার রোশানলে পড়তে হয় না। যে জল দিয়ে ১৪ রকম শাক ধোয়া হয় সেই জলটি আবার বাড়িতে ছেটানোর প্রথাও রয়েছে প্রচলিত। এর ফলে অশুভ শক্তি দূর হয় এবং সমস্ত বাধা বিপদ কেটে যায়।

ভূত চতুর্দশীর দিন ১৪ রকম শাক খাওয়ার রীতি:

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, ভূত চতুর্দশীর দিন ১৪ রকম শাক খাওয়ার রীতি সম্পর্কে:

আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি রান্না করে খেয়ে থাকি, বিভিন্ন শাক, পাতা রান্না করা হয়, তাদের থেকে কিন্তু ভূত চতুর্দশীর দিন যে ১৪ রকম শাক রান্না হয় সেগুলি একটু আলাদা। এই ১৪ রকম শাক সম্পূর্ণ ভেষজ গুণে ভরপুর।

আমরা হয়তো অনেকেই তাদের সব নাম ঠিকঠাক ভাবে জানিই না। বিশেষ করে রীতি মেনে চলার পাশাপাশি এই ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীরকে নানা সমস্যা থেকে রক্ষা করার জন্য এই ১৪ রকম ভেষজ শাক গুলি আপনার অনেকখানি সহযোগিতা করবে স্বাস্থ্যের উন্নতিতে।

এবার জানা যাক সেই চৌদ্দ রকম শাক গুলি কি কি ও তাদের ভেষজ গুনাগুন সম্পর্কে:

১) ওলের ডাঁটা:

ওল আমরা সবজি হিসেবে খেয়ে থাকি বিভিন্ন রকম ভাবে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ওল এর পাতা অথবা শাক যেটাকে ডাঁটা বলি সেটাও কিন্তু খাওয়া হয়ে থাকে।

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে ওই শাক রক্ষা করে মৌসুমী ঠান্ডা লাগা এবং সর্দি কাশির হাত থেকে, মুখের অরুচি দূর করে, পরিপাক ক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এই ওলের ডাঁটা।

২) বেতো শাক:

বাজারে হয়তো প্রায় সময় এই শাক চোখে পড়ে। লিভার কে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে বেতোশাক। এছাড়া খিদে না পাওয়া, কৃমির সমস্যা, পাইলসের যন্ত্রণা কম করতে এই শাক বিশেষভাবে ভূমিকা পালন করে।

কিডনিতে পাথর পড়লে অথবা মূত্রত্যাগের সময় যদি জ্বালা অনুভব হয় সে ক্ষেত্রে এই শাকের রস খেলে অনেকখানি আরাম পাওয়া যায়। তাইতো ভূত চতুর্দশীর দিন এই শাক ১৪ টি শাকের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

৩) কেঁউ শাক:

এই শাকের নাম হয়তো অনেকেই নাও শুনে থাকবেন। গুল্ম জাতীয় এই গাছ, বেশিরভাগ ঝোপঝাড়ের মধ্যেই জন্মায়, পেটে কৃমির সমস্যা কমাতে, খিদে বাড়াতে, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এই শাকের গুরুত্ব রয়েছে অপরিসীম।

এছাড়া চর্মরোগ নিরাময় করার জন্য অনেকখানি উপকারী, নিয়মিত এই শাক খেলে ত্বকের উজ্জ্বলতা ও লাবণ্য বৃদ্ধি পায়।

৪) কালকাসুন্দে:

১৪ টি শাক এর মধ্যে এই শাকেরও স্থান রয়েছে, কালকাসুন্দে এলার্জি এবং ত্বকের যেকোনো সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, জ্বর ও ক্ষত নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়, গুল্ম জাতীয় পাতা হয় এর।

সর্দি, কাশি, জ্বরে এই পাতার রস খাওয়ানো হয়, অরুচি এবং পেটের রোগ কমাতেও এই শাক বিশেষভাবে উপকারী দেহের জন্য।

৫) নিম পাতা:

নিম পাতার উপকারিতা সম্পর্কে আমরা তো সকলেই কম বেশি জানি। এর উপকারের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মধুমেহ থেকে পেটের যেকোনো রোগ নিরাময় করতে সাহায্য করে নিমপাতা।

প্রতিনিয়ত নিমপাতা খেলে শরীরে অসুখ বিসুখ বাসা বাঁধতে পারে না। এছাড়াও নিয়মিত যদি নিম পাতার রস খাওয়া যায়, তাহলে উজ্জ্বল ত্বক পাওয়ার সাথে সাথে ত্বকের কোনরকম সমস্যা দেখা দেয় না।

সেই কারণে বাচ্চাদের কৃমির সমস্যা দূর করতে নিম পাতার রস খেতে বলা হয়।

৬) সরষে শাক:

সরষে, যা থেকে তেল উৎপন্ন হয়, তবে কচি অবস্থায় সরষে গাছের শাক একটি সবজিও বলা যায়। বাঙালি পরিবারের পাশাপাশি অবাঙালি পরিবারেও এই শাক খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এমনকি পাঞ্জাবি পরিবারে এই শাকের রান্না প্রতিনিয়তই হয় বলতে গেলে।

যা কিনা ভেষজ গুণে সম্পূর্ণ। এই শাক খেলে রক্তে উপকারী কোলেস্টেরল বাড়ে এবং দেহে ভিটামিন ডি তৈরি করতে সাহায্য করে, যা কিনা আমাদের শরীরকে যেকোনো ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে থাকে।

৭) জয়ন্তী:

চেনা পরিচিত নামের মধ্যে পড়ে না বলতে গেলে, এই গুল্ম জাতীয় শাক যা কিনা ঝোপ ঝাড় এ জন্মায়, একেবারে অবহেলায় পড়ে থাকা এই পাতা, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে বহু সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়, তবে সবাই তা চিনতে পারেন না।

সাথে না চাওয়া একঘেঁয়ে কাঁচা সর্দি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, মাথা ভারী হয়ে থাকার সমস্যায় এই পাতা বিশেষভাবে কার্যকারী। এছাড়াও জয়ন্তি পাতার রস ব্যবহার করলে মধুমেহ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

৮) হিলঞ্চ শাক:

এর গ্রাম্য চলতি কথা অথবা নাম হলো হিঞ্চে শাক। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে এই শাক রক্ত পরিশুদ্ধ করে এবং খিদে বাড়ায়, এর পাশাপাশি পিত্ত সমস্যাতে অনেকখানি কার্যকরী, রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে এই শাক।

৯) শাঞ্চে শাক:

এই শাকের নাম অনেকেই জানেন, কেন না বিভিন্ন জায়গায়, জলা জমিতে এই শাক জন্মে থাকে বহু পরিমাণে।

যা কিনা পেট ঠান্ডা রাখে, পরিপাক ক্রিয়ায় সাহায্য করে, খিদে বাড়ায়, প্রচুর ফাইবার থাকার জন্য এই শাকের সেবনে রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রিত হয়, রোগ প্রতিরোধ করে।

অনাদরে জন্মালেও এই শাক শরীরের জন্য অনেক বেশি উপকারী।

১০) পলতা শাক:

এই শাক যেদিকে বেশি পটল চাষ হয় সে দিকের মানুষেরা বলতে গেলে প্রায় সময় খেয়ে থাকেন। পটলের পাতাই পরিচিত পলতা পাতা নামে, অথবা পলতা শাক নামে।

এই শাকও খিদে ও হজম শক্তি দুটি বাড়ায়। আর এই পাতা কিন্তু অনেকটা তিতো। যদি নিয়মিত এই পলতা পাতা খাওয়া যায় তাহলে অনেক দিনের পুরানো কোষ্ঠকাঠিন্যও দূর হয়ে যায়।

১১) গুলঞ্চ লতা:

আমাদের পরিবেশে আনাচে-কানাচে অনেক নাম না জানা শাক জন্মায়, তবে এগুলোর মধ্যে অনেক গুলি শাক কিন্তু ভেষজ গুনে সমৃদ্ধ, আমরা জানি না বলে সেগুলোকে এড়িয়ে চলি, তার মধ্যে গুলঞ্চ লতা হলো একটি।

ঋতু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই শাক শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে অনেক গুণ। পেটের আলসার, গেঁটে বাত, জন্ডিস, মধুমেহ, যক্ষা ও কোষ্ঠকাঠিন্য তে এই শাক বিশেষভাবে উপকারী।

১২) শৌলফ: 

এই শাক পুরনো ক্ষত, জ্বর, চোখের সংক্রমণ উপশমে বিশেষভাবে সাহায্য করে। মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ বাড়াতে এবং বাচ্চাদের পেটের গন্ডগোল সারাতে এই শাক দেওয়া হয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসা অনুসারে। আর এই শাকটিও কিন্তু এই ভূত চতুর্দশীতে ১৪ টি শাকের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

১৩) শুষনি শাক:

এই শাক অনেক পুকুরে আপনি দেখতে পাবেন এবং খুব পরিচিত একটি নাম, চর্মরোগ, মুখের আলসার, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যায় আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা শুষনি শাক খাওয়ার পরামর্শ দেন।

নিয়মিত এই শাক খেলে মানসিক চাপ জনিত যে কোন সমস্যা এবং মাথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। জলাভূমিতে, পুকুরে, আনাচে-কানাচে হয়ে থাকা এই শাক আপনার শরীরের জন্য আশীর্বাদ বলা যেতে পারে।

১৪) ভাট পাতা:

এই ভাট পাতা লিভারের সমস্যা, চুল পড়া, হাঁপানি, সর্দি, কাশি, চর্মরোগ এর পাশাপাশি নানারকম সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবহার করা হয়। আর ভাট পাতার নাম হয়ত অনেকেই শুনে থাকবেন।

পৌরাণিক মত অনুসারে ১৪ শাক খাওয়ার রীতির পিছনের রহস্য:

পুরান মতে ভূত চতুর্দশীতে ১৪ রকম শাক খাওয়া রীতি প্রচলন করেন ঋক বেদের বাস্কল অথবা শাক দ্বীপি ব্রাহ্মণরা। তবে কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, একজন ব্রাহ্মণ ও তার স্ত্রী নিজেদের বাড়ি খুব নোংরা করে রাখতেন।

পরিষ্কারের কোনরকম বালাই ছিল না, ফলে ক্রমশ নোংরা জমতে থাকে বাড়িতে। এর ফলে বাড়িতে আগমন হতে থাকে ভূতের। আর আমরা সকলেই জানি যে অপরিচ্ছন্ন জায়গায় কখনোই লক্ষ্মী বাস করেন না এবং সেই জায়গাতে অবস্থান করে ভূতেরা আর অশুভ শক্তি।

একদিন ওই ব্রাহ্মণের নজরে পড়ে সেই ভূতদের শোরগোল। এর পরেই তার ভুল ভাঙে, বাড়িঘর পরিষ্কার শুরু করেন এবং ১৪ ধরনের গাছের পাতা দিয়ে পুরো বাড়িতে গঙ্গাজল ছিটানো হয়। এরপর থেকেই ১৪ রকম শাক খাওয়ার নিয়ম শুরু হয়েছে বলে জানা যায়।

আর সেই কারণে প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা এই ১৪ রকম শাক মৃত ১৪ পুরুষের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। তাছাড়া এই চোদ্দ রকমের শাক রান্না করা হয়, আর শাক ধুয়ে সেই জল ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির প্রতিটি কোণে কোণে। যার ফলে সমস্ত অশুভ শক্তি ঘর থেকে বিতাড়িত হতে পারে, আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার সাথে সাথে বাড়িতে প্রবেশ করে শুভ শক্তি।

এই ১৪ রকম শাক এর একসাথে স্বাদ  কিন্তু তেতো হয়। ঋতু পরিবর্তনের সময় এই স্বাদ মানব শরীরে গড়ে তোলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। এই ১৪ শাকের কথা বাংলা পঞ্জিকাতেও উল্লেখ করা আছে। তবে বিভিন্ন জায়গায় এই শাক নিয়েও মতভেদ রয়েছে।

অনেক সময় ১৪ শাক এর তালিকায় ঢুকে পড়ে গিমে শাক, কলমি শাক এবং নোটে শাক। তবে এখন শহরাঞ্চল তো বটেই, তার পাশাপাশি গ্রামও কিন্তু এই ১৪ রকম শাকের সব কটা খুজে পাওয়া বর্তমান সময়ে খুবই কঠিন। তাই হাতের কাছে যে সমস্ত শাক পাওয়া যায় সেই শাক গুলি দিয়েই আয়ুর্বেদের গুনাগুন পাওয়া যেতে পারে।

Leave a Comment