বাল্যবিবাহ নিষেধ আইন কানুন ও শাস্তি কি? বাল্যবিবাহ অধিনিয়ম জানুন

ভারতে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে নিয়ম ও আইন কি? বাল্যবিবাহ করলে কি কি শাস্তি দেওয়া হয়? কত বয়স পর্যন্ত বাল্যবিবাহের মধ্যে পড়ে? আসুন জেনে নিন সঠিক বাল্যবিবাহ নিষেধ অধিনিয়ম ও আইন।

বর্তমান সমাজে যতই উন্নত হোক না কেন, এখনো পর্যন্ত এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে বাল্যবিবাহের মত সামাজিক ব্যাধি বিরাজমান। ভারতীয় বাল্যবিবাহ প্রাচীনকাল থেকে একটি প্রচলিত প্রথা বলা যায়। একটি ধর্ম অনুসারেই নয়, সমস্ত ধর্ম অনুযায়ী লম্বা সময় ধরে চলা এই প্রথা আজকের বর্তমান যুগে এসেও একেবারে বন্ধ হয়নি।

বাল্যবিবাহ নিষেধ আইন কানুন ও শাস্তি কি? বাল্যবিবাহ অধিনিয়ম জানুন
বাল্যবিবাহ নিষেধ আইন কানুন ও শাস্তি কি? বাল্যবিবাহ অধিনিয়ম জানুন

বর্তমান সময়ে এই প্রথা গ্রামীণ এলাকাতে বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। বাল্যবিবাহের পিছনে কারণ হলো মূলত গরিব রেখার নিচে বসবাস, শিক্ষা ও কন্যাদায় ইত্যাদি।

বাল্য বিবাহের তাৎপর্য যদি বলা যায়, তাহলে যখন বালক অথবা বালিকা অথবা দুজনার বিবাহের জন্য নির্ধারিত যে বয়স টা খুবই কম, বর্তমান সময় অনুসারে একজন ছেলের বয়স ২১ বছর আর একজন মেয়ের বয়স ১৮ বছর করা হয়েছে। যদি কোন ব্যক্তি এই নির্ধারিত বয়সের থেকেও কম বয়সে কোন ছেলে অথবা মেয়ের বিবাহ দিয়ে থাকেন, সেটি বাল্য বিবাহ হিসেবে পরিচিতি পায়।

তাছাড়া পরিবার দ্বারা বানানো এই ব্যবস্থার অধীনে যেখানে সহমতের কোন রকম জায়গা নেই, কিন্তু এতে করা বাল্যবিবাহ কিন্তু বৈধ নয়। বর্তমান সময়ে বাল্যবিবাহ যে কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা শূন্য অথবা শূন্যকরণ ঘোষিত করা যেতে পারে।

ঐতিহাসিক পৃষ্ঠভূমি: 

হরবিলাস শারোদা 1923 তে সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি বাল্য বিবাহ কে একেবারে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বিল প্রস্তাবিত করা হয়েছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বাল্যবিধবা ধরনের পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা। কেননা বিধবা বিবাহ সমাজে তখন বৈধ ছিল না, বিধবা বিবাহের জন্য কোনরকম অনুমতি পাওয়া যেত না।

পরবর্তীতে বাল্যবিবাহ নিষেধ অধিনিয়ম এ বলা হয় এই অধিনিয়ম এর অন্তর্গত বিবাহের জন্য নূন্যতম বয়স দেওয়া হয়েছে, সেক্ষেত্রে মেয়েদের নূন্যতম বয়স হবে ১৪ বছর এবং ছেলেদের নুন্যতম বয়স ১৮ বছর। 1978 তে বিবাহের জন্য নূন্যতম বয়স পরিবর্তন করে ছেলেদের জন্য ২১ বছর এবং মেয়েদের জন্য ১৮ বছর করা হয়েছে। আবার পরবর্তীতে ছেলেদের জন্য ২১ বছর থাকলেও মেয়েদের বয়স বেড়ে ২১ বছর করে দেওয়া হয়েছে।

যে সমস্ত বাচ্চাদের বিবাহ খুবই কম বয়সে করানো হয়েছে, তাদের কাছে এই বিবাহকে শূন্য করার জন্য কেবল মাত্র এক বছর সময় ছিল,. আর এই সময় সেই বাচ্চাদের জন্য পর্যাপ্ত নয় যা কিনা পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছিল যেসব বাচ্চারা।

বাল্য বিবাহের সাজা/ শাস্তি:

উপরিউক্ত অধিনিয়ম এর অন্তর্গত শাস্তি খুবই কম ছিল। নিয়ম অনুসারে একজন পুরুষ যার বয়স ১৮ বছরের বেশি এবং একুশ (২১) বছরের কম একটি বাল্যবিবাহ করে থাকেন তো, তার জন্য ১৫ দিনের সামান্য জেল অথবা ১ হাজার টাকা জরিমানা, বলতে গেলে জেল এবং ১,০০০ টাকা জরিমানা দুটোই হতে পারে।

আর যদি সেই পুরুষের বয়স ২১ বছরের বেশি হয় তাহলে শাস্তি হিসেবে তিন মাসের জেল আর জরিমানা দুটোই হবে।

যেকোনো বাল্যবিবাহ করার ক্ষেত্রে বা সঞ্চালিত করার জন্য বাবা উৎসাহিত করার জন্য যে সমস্ত মাতা-পিতার শামিল থাকবেন বা আরো অন্যান্য অভিভাবক শামিল থাকবেন তাদের তিন মাসের জেলের সাজা হতে পারে।

বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ অধিনিয়ম 2006:

2006 সালে সংসদ 1929 এর অধীনে আর তারপর সংশোধনের উপর ভিত্তি করে বাল্যবিবাহ নিষেধ অধিনিয়ম 2006 জারি করা হয়েছে। বর্তমান আইন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ অধিনিয়ম 2006 তিনটি উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ করে থাকে।

বাল্যবিবাহের উপরে সম্পূর্ণরূপে নিষেধাজ্ঞা বাল্যবিবাহ তে শামিল বাচ্চাদের সুরক্ষা আর তার সাথে অপরাধীদের ওপরে চালানো মামলা-মোকদ্দমা

বাল্যবিবাহ নিষেধ অধিকারীক:

ধারা 16 অনুসারে প্রত্যেক রাজ্য তে বাল্যবিবাহ নিষেধ অধিকারী নিযুক্ত করা হয়েছে। আর তাদের দ্বারা বাল্যবিবাহের মামলাতে খেয়াল রাখার জন্য বলা হয়েছে। আর এই সমস্ত অধিকারীকদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং এই আইন লংঘন করার ক্ষেত্রে রিপোর্ট তৈরি করা।

অপরাধের উপরে অপরাধমূলক কাজের জন্য দোষ চাপানো, যার মধ্যে বাচ্চার বাবা মা ও শামিল থাকতে পারেন, আর বাচ্চাদের বিপদজনক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার অধিকার দেওয়া হয়েছে এই সমস্ত আধিকারিক দের।

পার্সোনালি ল (ব্যক্তিগত আইন) এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ অধিনিয়ম বি-সংগতি:

কেননা ব্যক্তিগত আইন এখন বাল্য বিবাহের অনুমতি দিয়ে থাকে। আর পিসিএম অধিনিয়ম 2006 এই বিষয়টি বাধা দেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা করে থাকে, এমন পরিস্থিতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়।

ভারতীয় দণ্ডবিধি POCSO, PCMA (2006 অধিনিয়ম):

পোকসো এর ধারা 5 যেকোনো ব্যক্তির দ্বারা বাচ্চাদের উপরে এমন ধরণর যৌন অত্যাচার এর বিরুদ্ধে অপরাধী হিসেবে দণ্ডিত করা হয়। আই পি সি ধারা 375 অনুসারে যেকোনো ১৮ বছরের কম বয়সী মহিলার সাথে সহবাস আইনি রূপে দণ্ডনীয় অপরাধ। ধারা 375 তে অপবাদ রূপে পুরুষদের ১৫ বছরের বেশি কিন্তু ১৮ বছরের কম বয়সি বধুর সাথে বিবাহ সম্বন্ধের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

2017 তে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থট বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া এর মামলাতে সুপ্রিম কোর্ট এর ঐতিহাসিক রায় তে এটি নির্ধারিত করা হয়েছে যে, একজন পুরুষ দ্বারা তার স্ত্রী যার বয়স ১৮ বছরের কম, তার সাথে যৌন সম্পর্ক ভারতীয় দণ্ডবিধি 1860 অনুসারে ধর্ষণের সমতুল্য।

এছাড়া আইন যতই বাল্যবিবাহ নিয়ে জনগণের সচেতন করে থাকুক না কেন, এখনো বর্তমানে বাল্য বিবাহের মত সামাজিক প্রথা অনেক গ্রাম অঞ্চলে লক্ষ্য করা যায়। যেখানে শিক্ষার আলো খুবই কম, তার সাথে খুবই গরীব রেখার নিচে বসবাস করা মানুষ জন বাল্যবিবাহ কে এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করতে পারেন নি।

তবে এর ফল স্বরূপ অনেক রকম সমস্যা তৈরি হয় সমাজে, যার ফলে শুধুমাত্র সেই বাচ্চারাই নয় বাচ্চার বাবা মায়ের পরিবারেও নেমে আসে অনেক রকমের সমস্যা। তাই এমন অপরাধ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করাটাই উচিত।

তাহলে বাচ্চাদের এমন জঘন্যতম পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা সহজ হবে আইন অনুসারে, কিন্তু বাচ্চাদের অভিভাবক এবং বাবা-মায়েরা যারা এমন বিয়ের জন্য অনুমতি দিয়ে থাকবেন তাদের জন্য আইন খুবই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *