Maha Ashtami 2023: মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার মাহাত্ম্য জেনে নিন

দুর্গাপূজার সাথে বিভিন্ন নিয়ম জড়িয়ে থাকার পাশাপাশি মহাষ্টমীতে কুমারী পূজার রীতি প্রচলিত রয়েছে, এ সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানেন। দুর্গা পূজার অন্যতম রীতি হল কুমারী পূজা, অষ্টমী তিথির পূজা শেষ হয়ে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এখনো ঋতুমতি হয়নি এই রকম কোনো মেয়েকে এই বিশেষ শুভদিনে দেবী রূপে পূজা করা হয়। এছাড়া কালীপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, অন্নপূর্ণা পূজা, এমনকি শক্তি পূজাতেও করা হয় কুমারী পূজা, যা নারী শক্তির পরিচায়ক।

ছোট্ট বাচ্চা মেয়েকে সুন্দর করে লাল বেনারসিতে সাজিয়ে সুন্দরভাবে ফুলের মালা পরিয়ে দেবী রূপে পূজা করা হয় দেবী দুর্গার সামনে বসিয়ে। তবে দেখতে খুব সুন্দর লাগার পাশাপাশি এই কুমারী পূজার মাহাত্ম্য রয়েছে অনেক খানি। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী মা কালীর হাতে কোলাসুর বধের প্রতিকি হলো কুমারী পূজা, কথিত রয়েছে কোলাসুর স্বর্গ ও মর্ত্য অধিকার করে নিয়েছিল।

মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার মাহাত্ম্য জেনে নিন
মহা অষ্টমীতে কুমারী পূজার মাহাত্ম্য জেনে নিন

দেবতারা মা কালীর কাছে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করেন তাঁদের প্রার্থনা শুনে মা কালী আবার জন্ম নেন শিশু কন্যা রূপে এবং কোলাসুরকে বধ করেন। দেবী পুরান, স্তোত্র, কবচ, যোগিনী তন্ত্র, কূলরনবতন্ত্র, সহস্র মন, তন্ত্রসর, প্রান্তশিনি ও পুরোহিত দর্পণে কুমারী পূজার উল্লেখ রয়েছে।

শুভ অষ্টমী শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক মহাষ্টমীতে কুমারী পূজার কিছু কথা:

কুমারী পূজার বৈশিষ্ট্য:

দুর্গাপূজার সাথে কুমারী পূজা বিশেষভাবে জড়িত, এই পূজার বৈশিষ্ট্য হলো কুমারী কোন মেয়েকে পূজা করার সময় দেখা হয় না তার কোন ধর্ম, জাত- পাত, বর্ণভেদ। ১ থেকে ১৬ বছর বয়সের যে কোনো মেয়েকে কুমারী রূপে পূজা করা হয় এবং সেই মেয়েকে অবশ্যই কুমারী হতে হবে এমনকি বারবনিতার সন্তানও হতে পারে বলে মনে করা হয়।

এক বছরের মেয়ে সন্ধ্যা এবং ৭ বছরের মেয়ে মালিনী ১২ বছরের কুমারী কন্যাকে ভৈরবী এবং ১৬ বছরের কুমারী কন্যা কে অম্বিকা নামে ডাকা হয়।

বিশ্বাস করা হয় যে কুমারী পূজা করলে সমস্ত বিপদ কেটে গিয়ে শুভ দিনের সূচনা হয়। দার্শনিক মতে কুমারী পূজা সমাজে মেয়েদের মূল্য প্রতিষ্ঠা করে এবং নারী শক্তির প্রতিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর পাশাপাশি কুমারীত্বকে মনে করা হয় শক্তির বীজ, স্মৃতি, সৃষ্টি, লয়ের প্রতীক।

নারীত্ব ও প্রকৃতির প্রতীক কুমারিত্ব আর সেই কারণেই মনে করা হয় কুমারীর মধ্যেই নেমে আসেন দেবী দুর্গা। আর তাইতো কুমারী রূপেই দেবী দুর্গাকেই পূজা করা হয়।

শুভ কুমারী পূজা শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

কুমারী পূজার নিয়ম:

কুমারী পূজার ক্ষেত্রে যেহেতু কুমারিকে দেবী রূপে পূজা করা হয় তাই সম্পূর্ণ পূজা নিয়ম মেনেই কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমী পূজা শুরু করা হয়, মহাষ্টমীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হল কুমারী পূজা। যেখানে একজন কুমারী কে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়, যেসব বালিকারা ঋতুমতী হয়নি সেই সব বালিকাদের পূজা করা হয়।

সেক্ষেত্রে ১ বছর থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত বয়স হতে পারে। ১৬ টি উপকরণ দিয়ে পূজার সূত্রপাত হয় এবং প্রথমেই গঙ্গাজল ছিটিয়ে কুমারীকে শুদ্ধ করে তার পা দুটি ধুয়ে তাকে বিশেষ অর্ঘ্য প্রদান করা হয়।

আর অর্ঘ্যর শঙ্খ পাত্রকে সাজানো হয় বেলপাতা, গঙ্গাজল, চন্দন, ফুল ও দুর্বা ঘাস, আতপ চাল দিয়ে, দেবী অথবা কুমারীর গলায় পরানো হয় ফুলের মালা। এরপরে পাঁচটি উপকরণ দেওয়া হয় কুমারী পূজাতে।

অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধি স্থলে করা হয় সন্ধি পূজা, মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় ১০৮ টি প্রদীপ জ্বালানো হয়, ১০৮ টি পদ্ম ফুল এবং তার সাথে করা হয় সন্ধিপূজার আয়োজন, কথিত আছে মহিষাসুর বধের সময় সন্ধিক্ষণে দেবী দুর্গা চামুণ্ডা বা কালীমূর্তি রূপ ধারণ করেছিলেন। আর সন্ধিক্ষণের কথার অর্থ হলো মিলন।

দুর্গাপূজার দিন গুলিতে কোন দিন কোন পোশাক পরবেন? চলুন জানা যাক

কেন করা হয় কুমারী পূজা?

প্রাচীনকালে মুনি ঋষিরা প্রকৃতিকে নারীর সমান বলে মনে করতেন। তাই কুমারী পূজার মাধ্যমে প্রকৃতিকে পূজা করেন তাঁরা এবং তার সাথে সাথে দেবী দুর্গাকেও কুমারী রূপে পূজা করা হয়। কারণ তাঁরা মনে করতেন মানুষের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বর। বিশেষ করে যাঁদের মন সৎ, যাঁরা নিষ্পাপ তাঁদের মধ্যে ভগবানের প্রকট সব থেকে বেশি বলে মনে করা হয়।

এই গুণ কেবলমাত্র কুমারীদের মধ্যে থাকতে পারে এই ভেবে তাদের দেবী রূপে পূজা করা হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকে আজও পর্যন্ত।

কুমারী কে নতুন বস্ত্র, ফুলের মালা, মুকুট, পায়ে আলতা, কপালে সিঁদুর, ও তিলক পরিয়ে সাজিয়ে তোলা হয় দেবীরূপে। বয়স ভেদে কুমারীর নাম হয় ভিন্ন ভিন্ন। তবে কুমারী পূজার জন্য সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছরের কন্যাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মনোনীত করা হয়। কিন্তু ১ বছর থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত ঋতুমতি না হওয়া কুমারীকে পূজা করা যেতে পারে।

শত্রুদের ধ্বংস, সকল কর্মের শুভ ফল পেতে এই পূজা করা হয়ে থাকে, সনাতন ধর্মে সম্মানের দিক থেকে নারীকে শ্রেষ্ঠ আসনে বসানো হয়েছে, তাই শাস্ত্রকাররা নারীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে এই কুমারী পূজার কথা বলেছেন এবং সেই কুমারী পূজার প্রথাও চলে আসছে।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে আপনার ও পূজার ঘরটিকে সাজান এই পদ্ধতিতে

কুমারী পূজায় বয়স ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম:

আমরা আগেই জেনেছি যে ১ বছর বয়স থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত ঋতুমতী না হওয়া যে কোন কুমারী মেয়েকে দেবী রূপে পূজা করা হয়, তবে এই এক একটি বছরের কুমারীকে এক একটি নামে জানা যায়। কোন বছরের কুমারী কে কি নামে ডাকা হয়, সেগুলি নিচে দেওয়া হল:-

  • ১ বছরের কন্যাকে সন্ধ্যা নামে ডাকা হয়,
  • ২ বছরের কন্যাকে সরস্বতী,
  • ৩ বছরের কন্যাকে ত্রিধা,
  • ৪ বছরের কন্যাকে কালিকা,
  • ৫ বছরের কন্যাকে সুভাগা,
  • ৬ বছরের কন্যাকে উমা,
  • ৭ বছরের কন্যাকে মালিনী,
  • ৮ বছরের কন্যাকে কুব্জিকা,
  • ৯ বছরের কন্যাকে কালসন্দর্ভা,
  • ১০ বছরের কন্যাকে অপরাজিতা,
  • ১১ বছরের কন্যাকে রুদ্রানী,
  • ১২ বছরের কন্যা কে ভৈরবী,
  • ১৩ বছরের কন্যাকে মহালক্ষ্মী নামে ডাকা হয়,
  • ১৪ বছরের কন্যাকে পীঠনায়িকা,
  • ১৫ বছরের কন্যাকে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং
  • ১৬ বছরের কন্যাকে অম্বিকা নামে ডাকা হয়।

দূর্গা পূজার এই অজানা বিষয়গুলি আপনি জানেন কি? জেনে নিন

কুমারী পূজার ইতিহাস:

শাস্ত্র অনুসারে জানা যায় যে, কুমারী পূজার উদ্ভব হয় বানাসুর বা কোলাসুরকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, কোলারসুর নামের এক অসুর একসময় স্বর্গ ও মর্ত্য অধিকার করে নেয় এবং অত্যাচার চালাতে থাকে, স্বর্গ মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবতাগন মহাকালির শরণাপন্ন হন এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য। সেই সকল দেবগণের আবেদনে সাড়া দিয়ে দেবী মানব কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং কুমারী থাকা অবস্থায় কোলাসুর কে হত্যা করেন।

আর এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়। আর সেই থেকেই প্রতিবছর দুর্গা দেবীর মহাষ্টমী পূজা শেষে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা দেবী রূপে পূজা করা হয় এবং প্রকৃতি রূপেও পূজা করা হয়। মতান্তরে নবমী পূজার দিনেও এই পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে, তবে কিছু কিছু জায়গায় মহানবমী তে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

অষ্টমীতে পূজার সঠিক বিধি ও অঞ্জলি সম্পর্কে জানা আছে কি?

কুমারী পূজায় স্বামী বিবেকানন্দের ভূমিকা:

প্রকৃতি, শক্তি, সৃষ্টি এবং দেবী দুর্গা হিসাবে কুমারীকে পূজা করা হয় তা তো আমরা সকলেই জানলাম। নারীদের দেবীভাব আরোপ করে তার পূজা করা হয় এবং জানা যায় যে ভাবনায় ভাবিত হয়ে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব নিজের স্ত্রী সারদা দেবী কে ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করেছিলেন। সেই ১৯০১ সাল থেকে চিরাচরিত রীতি মেনে কুমারী পূজা হয়ে আসছে বেলুড় মঠে।

সারদা মায়ের উপস্থিতিতে স্বামীজি নিজেই কুমারী কন্যাকে পূজা করেছিলেন, নয়টি ব্রাহ্মণ কন্যাকে পুজোর মধ্যে দিয়েই মঠে কুমারী পূজার রীতি চালু হয়েছিল।

এখন অবশ্য আর নয়টি কন্যার পূজা হয়না তবে রীতি মেনে অল্পবয়সী একজন ব্রাহ্মণ কন্যার আরাধনা করা হয়। শুধুই রাজ্য নয় রাজ্যের বাইরে ও বিভিন্ন শহরেও দুর্গা অষ্টমীর দিন কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদ। যোগী রাজ্যের এই শহরের বিখ্যাত এক হাজারী কালী মন্দিরের কুমারী পূজা কে উপলক্ষ্য করে সকাল থেকেই নেমে আসে ভক্তদের ঢল।

বিজয়া দশমীতে এই নিয়মগুলি মানলে মায়ের কৃপা সর্বদাই থাকবে আপনার উপর

✨ হিন্দু ধর্ম অনুসারে দেবী দুর্গা কালী রূপ ধারণ করেছিলেন এবং তিনিও কুমারী রূপে অসুর বধ করেছিলেন, সেই হিসেবে হিন্দুদের মাতৃরূপে অবস্থিত হলো এই কুমারী একটি শক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সর্বব্যাপী ঈশ্বরের মাতৃভাবে আরাধনা করার জন্য কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

আবার কুমারী পূজার মাধ্যমে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ নিজেকেই শ্রদ্ধা জানায়। কুমারী পূজা হলো তন্ত্র শাস্ত্র মতে অনধিক ১৬ বছর পর্যন্ত বয়সে ঋতুমতী না হওয়া কুমারী মেয়ের পূজা।

এমন কুমারী মেয়েকে দেবী দুর্গার প্রতিক হিসেবে মনে করা হয় এবং পূজা করা হয়। বিশেষত দুর্গাপূজার অংশ হিসেবে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয় এ ছাড়া কালী পূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, কামাখ্যাদি শক্তি ক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। তবে বর্তমানে কুমারী পূজার প্রচলন অনেকখানি কমে গিয়েছে, অনেক পূজা মণ্ডপে, বাড়িতে এই কুমারী পূজা দেখা যায় না বললেই চলে। তবে কিছু কিছু জায়গায় এই কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। যা কিনা দুর্গাপূজার এই ঐতিহ্যকে এখনও অটুট রেখেছে।

Leave a Comment