Holi 2024: দোল আর হোলি কি এক? জানুন রঙের সঠিক ইতিহাস

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান যা অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সকলের জীবনে উৎসবগুলির মধ্যে এমন অনেক রহস্য, ঐতিহ্য রয়েছে যেগুলি অনেক ক্ষেত্রে এক রকম মনে হলেও তা কিন্তু আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

এই যেমন ধরুন না দোল পূর্ণিমাতে দোল ও হোলি একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও আমরা এই দুটিকে একটাই উৎসব হিসেবে মনে করি। কিন্তু আসলে এই দুটি বিষয় কিন্তু এক নয়।

বাংলায় এটি দোলযাত্রা, দোল পূর্ণিমা বা দোল উৎসব নামে পরিচিত হলেও ভারতের আরও অন্যান্য বেশিরভাগ জায়গাতেই এই রঙের উৎসবকে “হোলি” বলা হয়। আর আমরা রং খেলার বিষয়টাকে হোলি খেলা হিসেবে মনে করি। তবে এই দুটি কিন্তু একদিনে পালিত হয় না, দুটি দিন পালিত হয়, একদিন দোল এবং তারপরে দিন হলো হোলি।

হোলি: দোল আর হোলি কি এক? জানুন রঙের সঠিক ইতিহাস
হোলি: দোল আর হোলি কি এক? জানুন রঙের সঠিক ইতিহাস

এই দুই দিনই একই উৎসব হিসেবে সকলকে “হ্যাপি হোলি” বলে শুভেচ্ছা আদান প্রদান করে থাকেন অনেকেই, তবে আবার অনেকে একটু ঘুরিয়ে বলেন যে, “আজ দোল কাল হোলি”। সব দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, হোলি এবং দোল আসলে আলাদা আলাদা দুটি উৎসব।

আর এই উৎসব দুটি মিশে একটি এমন উৎসব আমরা পাই যেখানে সকলে মিলে রং খেলা, হোলিকা দহন অথবা ন্যাড়া পোড়ানো সবকিছু মিলিয়ে এই উৎসবটি খুবই সুন্দরভাবে উদযাপন করি।

আসুন জানা যাক, দোল উৎসব এবং হোলি উৎসব এই দুটি বিষয় আলাদা আলাদা হলেও একই উৎসব হিসাবে আমরা মনে করি, এই দুটির মধ্যে একটু পার্থক্য জানা যাক:

দোল পূর্ণিমাতে দোল উৎসব:

বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার সাথে, আরও অন্যান্য গোপিনী দের সাথে রং খেলায় মেতে উঠেছিলেন, এই ঘটনা সকলেই কম বেশি জানেন। দোল উৎসব শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধিকার কাহিনীর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই দোল পূর্ণিমার দিন শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার সাথে আবির খেলায় মেতে ছিলেন।

আজও বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা দোল পূর্ণিমার দিন রাধা কৃষ্ণের মূর্তিতে প্রথম আবির অর্পণ করেন তারপরে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ দোলায় চড়িয়ে শুরু হয় নগর সংকীর্তন। এছাড়া দোলের দিন কৃষ্ণ নামে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ত্রিভুবন।

শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি মধুরা ও রাধিকার জন্মস্থান জগতবিখ্যাত বৃন্দাবনে ১৬ দিন ধরে এই দোল উৎসব পালিত হয়। তার রেস আমাদের আশেপাশের আরো অন্যান্য রাজ্যেও খুবই সুন্দরভাবে এসে প্রতিফলিত হয়। ভক্তরা একে অপরকে আবির দিয়ে দোলের শুভেচ্ছা জানান আর রং খেলায় মেতে ওঠেন।

এখানে উল্লেখযোগ্য ভাবে বলা যায় যে, এই বিশেষ দিনে আবার হিন্দু বঙ্গ সমাজে পালিত হয় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মদিন। বিশেষ করে নদীয়ার নবদ্বীপ, মায়াপুর, কৃষ্ণনগর, পশ্চিমবঙ্গে এই তিথি উপলক্ষে বিশেষ পূজা অর্চনার আয়োজন করা হয়। বাংলার বাইরে উড়িষ্যতেও ধুমধাম করে পালিত হয় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি।

শ্রীকৃষ্ণ প্রেমের দেবতা, তিনি রাধিকা ও আরও গোপীনি দের সাথে এই রং খেলা অথবা হোলি খেলায় মেতে ছিলেন। তাই সকল মানুষের মধ্যে এই প্রেমের বার্তা রঙের উৎসব আজও বিদ্যমান। এই উৎসবটি শ্রীকৃষ্ণকে উৎসর্গ করে সকলে খুবই নিষ্ঠা ভরে পালন করেন।

হোলি উৎসব:

আমরা আগেই জানলাম দোল খেলার সাথে হোলিকা দহনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হোলি নামটা এসেছে “হোলিকা” থেকে। তবে এই উৎসবের সাথে একটি ঘটনা বা পৌরাণিক কাহিনী জড়িত রয়েছে।

চলুন তাহলে, হোলি উৎসবের সাথে পৌরাণিক কাহিনী সম্পর্কে একটু জানা যাক:

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায়, অসুর রাজ হিরণ্যকশ্যিপু অমর হতে চেয়েছিলেন, সেই জন্য ব্রহ্মার নিকট হতে অমরত্বের বর প্রাপ্তির জন্য তিনি কঠোর তপস্যয় নিমজ্জিত হন।

কিন্তু দেবতারা অমরত্ব দান করেন নি, তাই হিরণ্যকশ্যিপু এমন বর চান যে, তাকে মানুষও হত্যা করতে পারবে না, আর কোন প্রাণী ও হত্যা করতে পারবে না, তাকে ঘরেও হত্যা করা যাবে না, আবার বাইরেও হত্যা করা যাবে না, তার সাথে সাথে দিনেও হত্যা করা যাবে না, আবার রাতেও হত্যা করা যাবে না, তাকে অস্ত্রের দ্বারাও হত্যা করা যাবে না, আবার অস্ত্র ছাড়াও হত্যা করা যাবে না, এমনকি স্থল, জল, বায়ু কোথাও তাকে হত্যা করা যাবে না এমন বর তিনি চেয়ে বসেন।

এই বর লাভ করে হীরণ্যকশ্যিপু অহংকারী হয়ে ওঠেন এবং মনে করেন যে পরোক্ষভাবে তিনি অমরত্ব লাভ করে ফেলেছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে কেবল তাকেই দেবতা হিসেবে পূজা করা হবে কেননা তিনি অমর হয়ে গেছেন। কিন্তু হীরণ্যকশ্যিপুর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন একজন বিষ্ণু ভক্ত। তিনি তার পিতার আদেশ অমান্য করে বিষ্ণু আরাধনা করতে শুরু করেন।

এমন পরিস্থিতিতে হিরণ্যকশ্যিপু খুবই রেগে গিয়ে প্রহ্লাদকে হত্যা করার প্রচেষ্টা করেন। তাকে হত্যা করার জন্য বোন হোলিকার কাছে সাহায্য চান। হীরণ্যকশ্যিপুর বোন হোলিকার একটি অগ্নিনিরোধক শাল ছিল, যা আগুনে পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে।

এমন কথা অনুযায়ী প্রহ্লাদকে হোলিকা অর্থাৎ তার পিতার বোন পিসির কোলে বসতে আদেশ করা হয় এবং প্রহ্লাদের উপরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে সেই অগ্নিনিরোধক শাল থাকার কারণে হোলিকা বেঁচে যাবে কিন্তু বিষ্ণু মারা যাবে আগুনে পুড়ে, এমনটা পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু প্রহ্লাদ ছিলেন অসম্ভব বিষ্ণুভক্ত, বিষ্ণু নাম জপ করতে থাকেন, এর ফলে হোলিকা নিজের গায়ে থেকে সেই শাল খুলে প্রহ্লাদের শরীরকে আবৃত করে, আর হোলিকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, এর ফলে প্রহ্লাদ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়।

ওই আগুন হল অশুভের বিরুদ্ধে শুভ এর জয়ের প্রতীক। সেই কারণে আজও অশুভ শক্তিকে দগ্ধ করার জন্য হোলিকা দহন পালিত হয় আর হোলিকা পুড়ে যাওয়ার পরের দিনই পালিত হয় হোলি।

দোল পূর্ণিমা অথবা হোলি যাই বলুন না কেন, এই দুটি উৎসব কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর অবতার এর উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়। এখনো শ্রীকৃষ্ণের দোল পূর্ণিমা, আর এক দিকে বিষ্ণুর এই হোলি। একটি উৎসব শ্রীকৃষ্ণের লীলার সঙ্গে যুক্ত এবং অপর একটি উৎসব হল নরসিংহ দেবের আবির্ভাব এর সঙ্গে যুক্ত।

তবে এই দুটি উৎসব একইসাথে পালিত হওয়ার সাথে সাথে দুটি একে অপরের সাথে বিশেষভাবে জড়িত। তাইতো কথায় আছে “আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া কাল আমাদের দোল…”। শুভ হোক সকলের দোল উৎসব এবং হোলি, তবে একসাথে বলা যেতেই পারে “হ্যাপি হোলি”।

Leave a Comment