আদালতে বিবাহ করার প্রক্রিয়া ও আইনি নিয়ম ও শর্ত

Court Marriage Laws and Procedure in Bengali: ভারতে আদালতে কোর্ট বিবাহ করার পক্রিয়া কি? | কিভাবে আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করা যায়? | ভারতে আদালতে কোর্ট বিবাহ করার আইনি নিয়ম ও শর্ত | জানুন ভারতে বিচারালয়-এ বিবাহ প্রক্রিয়া ও আইনি নিয়ম।

বিবাহ একটি সুন্দর বন্ধন, যেখানে দুটি মানুষের সাথে দুটি পরিবারের মিলন ঘটে। তবে বর্তমানে অনেকেই বড় আকারে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ সম্পন্ন করার থেকে আইনত ভাবে কোর্ট বিবাহ অথবা বিচারালয় এ বিবাহ সম্পন্ন করার ইচ্ছা  প্রকাশ করে থাকে।

এছাড়া ভারতে আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করা সেই জুটি অথবা কাপলদের জন্য খুবই জনপ্রিয় একটি বিকল্প, যেখানে বিবাহ খুবই সহজ এবং সরল ভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে এবং যদি পাত্র-পাত্রী অন্তর ধর্মীয়, আন্তর জাতি হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে এই বিচারালয় এ বিবাহ সম্পন্ন করার বিষয়টি খুবই গ্রহণযোগ্য।

আদালতে বিবাহ করার প্রক্রিয়া ও আইনি নিয়ম ও শর্ত
আদালতে বিবাহ করার প্রক্রিয়া ও আইনি নিয়ম ও শর্ত

ভিন্ন ধর্মী ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন করতে গেলে এই আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করা একটি অনন্য উদাহরণ। যেখানে পারম্পরিক বিবাহ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে খুবই বড় আকারের ধুমধাম ভাবে রীতি, নিয়ম কানুন পালন করার মধ্যে দিয়ে যে বিবাহ হয়ে থাকে, কোর্ট বিবাহ একটি সাধারন প্রক্রিয়া বলতে পারেন। যে বিবাহ রেজিস্ট্রার আর কিছু সাক্ষীর সাক্ষ্য অনুযায়ী পাত্র-পাত্রী বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন।

বিশেষ বিবাহ অধিনিয়ম 1954 অনুযায়ী আদালতে এমন বিবাহ সম্পন্ন করা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে সিভিল সমারোহ এর মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম বিবাহ সম্পন্ন করা হয়। আর এই পদ্ধতি অনুসারে রেজিস্ট্রি এবং বিয়ে দুটি কাজ একই সময়ে সম্পন্ন করা হয়।

ভারতে আদালতে কোর্ট বিবাহ করার শর্ত:

আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করা অথবা কোর্ট বিবাহ করার জন্য প্রথমে কোন শর্ত গুলি পূরণ করা অবশ্যই প্রয়োজন?

বিশেষ বিবাহ অধিনিয়ম 1954 এর অনুসারে কিছু শর্ত আছে নির্ধারিত। যেগুলি সই করা অথবা সই করার আগে দুই পক্ষকে সম্পূর্ণরূপে পূরণ করতে হবে।

যে সমস্ত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে সেগুলি হল:

১) যে কোন পক্ষের মধ্যে অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে বৈধ বিবাহ যেন না হয়ে থাকে।

২) পাত্রীর বয়স ১৮ বছর হতে হবে এবং পাত্রের বয়স ২১ বছর হতে হবে।

৩) পাত্র-পাত্রী দুজনকে কিন্তু সুস্থ মস্তিষ্কে এই বিয়ের জন্য মত দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে এবং সেখানে বৈধ সহমতি যেন থাকে।

৪) তাছাড়া পাত্র পাত্রী বিয়ে এবং বাচ্চা প্রজনন এর ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত যেনো না হয়ে থাকে।

৫) তাছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে কোনরকম অধিনিয়ম অনুসূচী 1 এ প্রদান করা যে নিষিদ্ধ সম্পর্ক গুলি রয়েছে সেগুলোর মধ্যে যেন না আসে। যতক্ষণ না পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী দুই পক্ষের ধর্ম ও পরম্পরা মান্য না করে থাকে।

আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া কি?

আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য যে সমস্ত প্রক্রিয়া গুলি আপনাকে করতে হবে সেগুলি হল:

১) আবেদনপত্র অথবা বিবাহ সূচনা পত্র দায়ের করতে হবে অথবা জমা করতে হবে।

২) এছাড়া দুই পক্ষের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবাহ অধিনিয়ম অনুসূচী 2 তে যে সমস্ত নির্ধারিত লিখিত নোটিশ দেওয়া রয়েছে সেগুলির জন্য আবেদন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

৩) এই নোটিশ সেই জেলার বিবাহ রেজিস্ট্রার এর কাছে জমা করতে হবে যেখানে কোন পক্ষেরই উল্লেখিত নোটিশ জমা করার কমপক্ষে ৩০ দিন আগে এটি জমা নেওয়া হবে।

সূচনার প্রকাশ:

নোটিশ জমা করার পর জেলার বিবাহ অধিকারী যাকে আপনি নোটিশ দিয়েছেন বা দেওয়া হয়েছে তিনি এই নোটিশ প্রকাশিত করবেন। এই নোটিশ কার্যালয় এ আর জেলার কার্যালয় এ একটি প্রতিনিধি অনুসারে বিশিষ্ট জায়গায় প্রকাশিত করা হবে।

বিবাহের জন্য কোন আপত্তি নয়:

যে কোন ব্যাক্তি অধিনিয়ম এর ধারা 4, অধ্যায় 4 তে উল্লেখিত নির্দিষ্ট সত্যের ওপর ভিত্তি করে জেলার বিবাহ আধিকারিক কে বিবাহের জন্য আপত্তি করতে পারেন। আবার যদি বিবাহ আধিকারিক এই নোটিশ প্রকাশ করার তারিখ অনুসারে ৩০ দিন এর ভিতরে যদি কোন ব্যক্তি এই বিয়ের সম্পর্কে আপত্তি করে থাকেন, তাহলে এই বিবাহ কোন মতেই সম্ভব হবে না সম্পন্ন করা।

যদি এই বিবাহ সম্পর্কে আপত্তি অভিযোগ দায়ের করা হয়, সে ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর জন্য উপায়:

বিবাহ সম্পন্ন যাতে না হয় সেই তারিখ অনুসারে ৩০ দিনের ভিতরে বিবাহ আধিকারিক অধিকার ক্ষেত্রে জেলার স্থানীয় সীমার ভিতর জেলা আদালতে দুই পক্ষের মধ্যে যেকোনো পক্ষ আপিল দায়ের করতে পারেন।

বিবাহের বিধি পূর্বক সম্পাদন:

আবার যদি ৩০ দিন শেষ হওয়ার আগে কোন আপত্তি অভিযোগ না আসে, তাহলে বিবাহ নির্দিষ্ট কার্যালয় এ সম্পন্ন করা হবে, বিবাহের জন্য দুইপক্ষ কে কার্যালয়ে তিনজন সাক্ষীর সাথে রেজিস্ট্রি এবং বিধি পূর্বক সম্পাদন সময় অনুসারে উপস্থিত হতে হবে।

বিয়ের প্রমাণপত্র:

নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে বিবাহ আধিকারিক দ্বারা বিবাহ প্রমাণপত্র দেওয়া হবে। যেখানে দুই পক্ষ এবং তিন জন সাক্ষীর সিগনেচার অথবা সই করতে হবে। আর এটাই হল আদালতে বিবাহ হওয়ার প্রমানপত্র হিসেবে সার্টিফিকেট।

আদালতে বিবাহ অথবা কোর্ট বিবাহ করার জন্য প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ:

১) নির্দিষ্ট ফিস এর সাথে নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে বিবাহের জন্য আবেদন পত্র।

২) পাত্র-পাত্রীর পাসপোর্ট সাইজের ফটোগ্রাফ।

৩) বিবাহের জন্য দুই পক্ষের ঠিকানার প্রমাণপত্র।

৪) দুই পক্ষের অথবা পাত্র-পাত্রী ডেট অফ বার্থ অর্থাৎ জন্ম তারিখ এর প্রমাণ পত্র বা বয়সের প্রমাণপত্র।

৫) তিনজন সাক্ষীর ঠিকানার প্রমাণপত্র, প্যান কার্ড প্রয়োজন পড়বে।

৬) ডেথ সার্টিফিকেট অথবা মৃত্যুর প্রমাণপত্র বা ডিভোর্স এর সার্টিফিকেট প্রয়োজন পড়বে যদি দুই পক্ষের মধ্যে কারও পূর্ব বিবাহ হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে।

বিবাহ রেজিস্ট্রেশন অথবা বিবাহ রেজিস্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ অথবা কাগজপত্র:

  • দুই পক্ষ দ্বারা রেজিস্ট্রেশনের জন্য সই করা আবেদন পত্র।
  • দুই পক্ষের পাসপোর্ট সাইজের একটি একটি করে ফটো।
  • তার সাথে বিয়ের ফটো।
  • পাত্র-পাত্রীর বয়সের প্রমাণপত্র অথবা বার্থ সার্টিফিকেট, ডেট অফ বার্থ।
  • বিবাহের প্রমাণপত্র, পূজারী অথবা পুরোহিতের প্রমাণপত্র। যে পুরোহিত বিবাহ সম্পন্ন করে থাকবেন।
  • রূপান্তরিত হওয়ার প্রমাণ পত্র যদি দুই পক্ষের মধ্যে কোন একটি পক্ষ ধর্ম পরিবর্তন করে থাকেন তো, সেখানে পুরোহিতের অথবা কাজী সাহেবের কাছ থেকে প্রমাণপত্র প্রয়োজন পড়বে।
  • উপরের এই সমস্ত বিবরণ এর সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সত্যি ঘোষণা করার মধ্যে দিয়ে দুই পক্ষের দ্বারা শপথ গ্রহণ করা অথবা শপথপত্র।
  • যথা অনুসারে আগের স্ত্রী অথবা স্বামীর ডিভোর্সের প্রমাণপত্র এবং মৃত স্ত্রীর অথবা স্বামীর ডেট সার্টিফিকেট এর প্রমান পত্রের প্রতিলিপি।
  • মুসলিম মেয়ে এবং হিন্দু ছেলের মধ্যে বিবাহের আইনি নিয়ম

  • হিন্দু মেয়ে ও মুসলিম ছেলের মধ্যে বিবাহের আইনি নিয়ম

আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য উকিল এর প্রয়োজন পড়বে কি?

এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা নেই, তবুও হ্যাঁ প্রয়োজন পড়বে। যে কোনো উকিল যে কোনো আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে আপনার সমস্ত রকম সমস্যার সমাধান করতে পারেন। সেখানে উপযুক্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণরূপে কাগজপত্র এবং আরো অন্যান্য প্রমান পত্রের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন করার সম্পূর্ণ প্রয়াস করে থাকেন।

এছাড়াও যদি এই বিয়ের বিরুদ্ধে কেউ আপত্তি করে থাকেন বা করতে পারেন, তাহলে এক্ষেত্রে কিন্তু একজন উকিল আপনি নিযুক্ত করতেই পারেন।

আর সেটাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। এক্ষেত্রে যদি কেউ আপত্তি করে থাকেন তখন কিন্তু আইন অনুসারে আপনি আপিল / অভিযোগ দায়ের করতে পারেন অথবা আদালতে আপনার হয়ে এই মামলা লড়তে পারবেন একজন অভিজ্ঞ উকিল।

বিবাহের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ যদি বিদেশি হয়ে থাকেন তখন কি করবেন ?

যদি দুই পক্ষের একটি পক্ষ বিদেশি হন তাহলে ভারতে বিবাহ রেজিস্ট্রার অথবা কোন বিদেশী দেশে বিবাহ আধিকারিক এর সমক্ষে এই বিয়ে অনায়াসেই সম্পন্ন করা যেতে পারে।

সে ক্ষেত্রে বেশ কিছু অতিরিক্ত দস্তাবেজ অথবা কাগজপত্র প্রয়োজন পড়তে পারে সেগুলি হল:- 

  • বিয়ের জন্য দুই পক্ষের পাসপোর্ট এবং বৈধ ভিসা প্রয়োজন পড়বে।
  • সম্বন্ধিত জেলাতে ৩০ দিনের আগে থেকে থাকার প্রমান পত্র অথবা সম্বন্ধিত এস এইচ ও এর রিপোর্ট।
  • পক্ষের মধ্যে কারো যদি বিদেশি বন্ধু অথবা সাথী থেকে থাকেন ভারতের সম্বন্ধিত দূতাবাস অথবা বাণিজ্য দূতাবাস এর এন ও সি অথবা বৈবাহিক স্থিতির প্রমাণপত্র।

তো এইভাবে আপনি খুবই কম সময়ের মধ্যে এবং কোন ঝামেলা ছাড়াই নিজের পছন্দের পাত্রী অথবা পাত্রের সাথে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারবেন বিচারালয় এ অথবা আদালতে, যেটা কে অনেকেই “কোর্ট বিবাহ” হিসাবে জানেন।

এছাড়া ভিন্ন ধর্মে বিবাহ করা যে বিষয়টা এখন বর্তমানে খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটার ক্ষেত্রেও আদালতে বিবাহ সম্পন্ন করা আরো বেশি সহজ হয়ে পড়েছে। তবে অবশ্যই এমন বিয়ের মধ্যে উপরের ঐ সমস্ত আইনি বিষয়গুলি মাথায় রাখবেন, যাতে কোনরকম সমস্যা যেন না তৈরি হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *