Charak Puja 2024: চড়ক পূজায় সন্ন্যাসীরা শরীরকে বাণবিদ্ধ করে শূন্যে ঘোরাতে থাকেন কেন? জানুন এর কারণ

বৈশাখ মাস থেকে শুরু করে চৈত্র মাসের শেষ উৎসব চড়ক পূজা দিয়ে বাঙালির এই সারা বছরের উৎসবের সমাপ্তি ঘটে, তবে সারা বছর ধরে চলা আরো অন্যান্য পূজা পার্বণের পাশাপাশি চড়ক পূজা খুবই জনপ্রিয়।

চৈত্র সংক্রান্তির দিন চড়ক পূজা হয়ে থাকে। চড়ক পূজার বেশ কয়েকটি নিয়ম অনেকখানি অদ্ভুত রকমের, তবে এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক প্রাচীন রীতি, প্রথা এবং আরো অন্যান্য ভয়ংকর কাহিনী।

চড়ক পূজায় সন্ন্যাসীরা শরীরকে বাণবিদ্ধ করে শূন্যে ঘোরাতে থাকেন কেন? জানুন এর কারণ
চড়ক পূজায় সন্ন্যাসীরা শরীরকে বাণবিদ্ধ করে শূন্যে ঘোরাতে থাকেন কেন? জানুন এর কারণ

চড়ক পূজা সম্পর্কে যে সমস্ত জানা-অজানা তথ্যগুলি রয়েছে, সেগুলি সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানেন না। এই পূজার বাইরের দিকটা অনেকটাই শান্ত এবং অন্যান্য পূজার মতো মনে হলেও এর ভিতরের অন্তর্নিহিত অর্থ আর নিয়ম রীতি গুলি অনেকটা অবাক করার মতো।

চড়ক পূজার বেশ কিছু নিয়ম সম্পর্কে জানা যাক:

এই পূজায় আরতি সহ মেলা, উৎসব পার্বণ, এর পাশাপাশি আরো অন্যান্য প্রথা ও রীতি রয়েছে, যেগুলি এই পূজার বিশেষ অঙ্গ বলা যেতে পারে।

১) এই পূজার সময় শিব পাঁচালী পাঠ করা চলতে থাকে, ভক্ত ও সন্ন্যাসী দের দ্বারা চড়ক গাছে জল ঢেলে প্রণাম করে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার রীতি রয়েছে, আর সেখানেই তাদের বাণবিদ্ধ করা হয়।

২) এই পূজায় শিব পাঁচালী পড়া রীতি তো থাকেই, তার পাশাপাশি পাঠক মন্ত্র পড়া শুরু করলে সন্ন্যাসীরা মহাদেবের নামে ধ্বনি দিতে দিতে নদীতে স্নান করতে যান, স্নানের পর মাটির কলসিতে জল ভরে এনে চড়ক গাছের গোড়ায় সমবেত হয়ে সেই গাছে জল ঢালতে থাকেন সকলে মিলে।

৩) সন্ন্যাসীরা নিজের শরীর বড় বড়শিতে বিদ্ধ করে চড়ক গাছে ঝুলে ঘুরতে থাকেন। অনেকে আবার সন্ন্যাসী দের আশীর্বাদের জন্য শিশুদের তাদের কাছে নিয়ে যান কাছাকাছি। যাতে তারা ঘোরা অবস্থায় সে শিশুদের ছুঁয়ে আশীর্বাদ করতে পারেন।

৪) সন্ন্যাসীরা ঘুরতে ঘুরতে কখনো কখনো শিশুদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন আবার এই অবস্থায় তারা এক হাতে বেতের তৈরি বিশেষ লাঠি ঘোরাতে থাকেন। তার পাশাপাশি অন্য হাতে দর্শনার্থী দের দিকে বাতাসা ছুড়ে দেন। এই বাতাসা অনেকেই খুবই পরম প্রসাদ হিসেবে তুলে বাড়িতে নিয়ে যান।

৫) এই চড়ক পূজই হলো গম্ভীরা অথবা শিবের গাজনের রকম ফের। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে অর্থাৎ চৈত্র মাসের একেবারে শেষ দিনে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন জায়গায়।

৬) সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অনুসারে এ জগতে যারা মহাদেবের সন্তুষ্টি লাভের জন্য স্বেচ্ছায় এমন কঠিন আরাধনার পথ বেছে নিয়েছেন, তারা মহাদেবের আশীর্বাদে মৃত্যুর পরে স্বর্গ লাভের সুযোগ পাবেন এমনটাই মনে করা হয়।

৭) তবে অনেক সময় আবার একটি লম্বা কাঠের তক্তায় সিদুর মাখিয়েও রাখা হয়। যাকে বলা হয় শিবের পাটা” আর এটাই সকলের কাছে বুড়ো শিব” নামে প্রচলিত এবং পরিচিত।

৮) এই পূজোর আরেকটি অঙ্গের নাম হল “নীল পূজা”, পূজার আগে চরক গাছের তলা এবং চরকগাছটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া হয় অবশ্যই।

এর পাশেই একটি পাত্রে জল ভরে তাতে শিব ঠাকুরের মূর্তির প্রতিক শিবলিঙ্গ রাখা হয়। প্রচুর ভক্তগন এখানে এসে শিবের মাথায় জল ঢেলে এই পূজার রীতি পালন করে থাকেন।

ইংরেজি মাস অনুসারে সম্পূর্ণ এপ্রিল মাস ধরে বাঙালিরা পালন করে থাকেন বিভিন্ন রকমের উৎসব। এর মধ্যে চৈত্র সংক্রান্তি ও চড়ক পূজা খুবই বিখ্যাত।

বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চৈত্র মাসের শেষ দিন বা চৈত্র সংক্রান্তিতে এই উৎসব পালিত হয় বিভিন্ন জায়গায়। এটি মূলত বাঙালি হিন্দুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকোৎসব।

চড়ক পূজা ও গাজন সম্পর্কে এই অজানা তথ্য আপনি এখনো জানেন না

চড়ক পূজার প্রচলন:

এই উৎসবের কথা কোনো পুরানে তেমন ভাবে কিন্তু উল্লেখ নেই, যেমন ধরুন লিঙ্গ পুরাণ, বৃহৎ ধর্ম পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ এই সমস্ত পুরাণে চৈত্র মাসের শিবের আরাধনা এবং উৎসবের উল্লেখ থাকলেও চড়ক পূজায় কিন্তু কোন রকম উল্লেখ নেই। তবে পাশুপাত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীন কালে এই উৎসব প্রচলিত ছিল বহুল পরিমাণে।

উৎখন সমাজের উচ্চ স্তরের লোকেদের মধ্যে এই উৎসবের প্রচলন থাকলেও মূলত নিম্ন সম্প্রদায়ের মানুষজন বেশি পালন করে থাকেন এই পুজো। লোকোমুখে শোনা যায় যে ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামের একজন রাজা প্রথমে এই পূজার প্রচলন করেছিলেন।

শুভ চড়ক পূজার শুভেচ্ছা বার্তা ও স্ট্যাটাস

চড়ক পূজায় কিছু অদ্ভুত ও দৈহিক যন্ত্রণাদায়ক রীতি:

আমরা আগেই জেনেছি এই পূজার অপর নাম গম্ভীরা পূজা বা শিবের গাজন। আগের দিন চড়ক গাছ থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখা হয়, এছাড়া পতিত ব্রাহ্মণ রা এই পুজোর পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন।

এই পূজার কিছু অদ্ভুত ও শারীরিক যন্ত্রণাদায়ক রীতি ও প্রথা হলো:-  জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হাঁটা, কাঁটা আর ছুড়ির উপর লাফানো, বানফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নি নৃত্য, কুমিরের পূজা, চরক গাছে দোলা এবং দানো বারানো বা হাজরা পুজো করা।

আবার এইসব পুজোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছে ভূত-প্রেত ও পুনর্জন্মবাদের উপর বিশ্বাস। এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রাচীন কৌম ও সমাজের নরবলির মতোই অনেকটা প্রায়।

পুজোর উৎসবে যারা অংশগ্রহণ করেন তারা বহু প্রকারের দৈহিক যন্ত্রণা সহ্য করে মনোরঞ্জন করে থাকেন যা ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচিত হয় আজও।

অনেক অদ্ভুত নিয়ম রীতি থাকা সত্বেও এই উৎসব আজও সাড়ম্বরে বিভিন্ন জায়গায় পালিত হয় ধুমধাম ভাবে। আর সেই সমস্ত উৎসবে অংশগ্রহণ করেন দূর দূরান্ত থেকে আগত ভক্তগণ ও দর্শনার্থীরা।

ব্রিটিশরা বন্ধ করেছিল চড়ক পুজার প্রথা জানুন চড়কের ইতিহাস

চড়ক পূজার কিছু রীতি ব্রিটিশদের দ্বারা বন্ধ করা হয়েছিল:

চরক গাছে ভক্ত এবং সন্ন্যাসীকে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুত বেগে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, এটাই হল এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ও প্রথা বলা যেতে পারে। তাদের পিঠে বড়শিতে আটকে, জ্বলন্ত বান শলাকা ঢুকিয়ে দেওয়ার রীতি ও রয়েছে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে।

১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে এই নৃশংস নিয়ম বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনো তা প্রচলিত রয়েই গেছে। তাদের বিশ্বাস অনুসারে এইভাবে এমন কঠিন পূজার রীতি মেনে চললে সরাসরি স্বর্গ লাভ করা যায়। আবার বাচ্চাদেরও অনেক সময় সাজিয়ে গ্রাম ঘোরানো হয়। সঙ্গে থাকে অনেক সখি।

এরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে নানা রকম মনোরঞ্জন করে দান সংগ্রহ করত। এর পাশাপাশি আগের দিন নীল পূজার পর সন্ন্যাসীরা উপোস থাকেন, পরের দিন বিকেলে এই বিশেষ চড়ক পূজা শেষ করেই তারা নিজেদের উপোস ভেঙে কিছু মুখে দেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *